হতংকুচো থেকে ফেরার পর রমজান মাস আর ঈদ-উল-ফিতর মিলে কোথাও যাওয়া হয়নি। মাসুম ভাইদের সাথে কথা হয়েই ছিল, ঈদের পরের প্রথম নাফাখুম-আমিয়াখুম ইভেন্টে হিট দ্য ট্রেইলের সাথে আমরা যাচ্ছি। এইবার ঈদের শপিং লিষ্টের শুরুতে তাই আমাদের তিনজনের লাইফ জ্যাকেট আর ট্রাভেল ব্যাগ ছিল!   

৭ই জুন রাতে আমরা বান্দরবানের উদ্দেশে শ্যে রওনা হবো। কাউন্টারে পৌঁছালাম আগেই। সেখানে হঠাৎই এক আপু এসে মিষ্টি হেসে সালাম দিয়ে বললেন, ‘আপু, আমি নি, আপনাদের সাথে যাচ্ছি।’ নামটা খুব অন্যরকম লেগেছিল, ঠিক যেন জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশনের কোন চরিত্র। পরে জেনেছি, নি অর্থ খুব মায়াময়, সবাইকে ভালোবাসে এমন এক মেয়ে। আপুর সাথে যায় বৈকি! সেখানে একে একে আরো পরিচয় হয়েছিল আয়েশা আপু, উল্লাস ভাই, শাহীন ভাই, রাসেল ভাই, মারুফা আপু, ফারহানা আপু, তাসনীম তিথি, আর তাসনীমের সাথে। এই তিথি আর তাসনীম বড়ই কিউট একটা কাপল। এবং দুজনের নামই আবার তাসনীম! তাজিংডং গ্রুপের ছোট ভাই শাবাবও ছিল আমাদের সাথে। চট্টগ্রাম থেকে ভাই-ব্রাদারদের মধ্যে ছিল আমাদের রাসেল ভাই আর ফারাবি। যথারীতি রাতের ঘুম পথেই দিয়ে ফেললাম আরকি! ভোরে পৌঁছালাম বান্দরবান শহরে। 

এক দল অভিযাত্রী। ছবি: মাসুম ভাই

ফ্রেশ হয়ে উঠে পড়লাম চান্দের গাড়িতে। গন্তব্য থানচি। রিজার্ভ গাড়ি, ঘণ্টা তিনেক লাগবে। চান্দের গাড়িতে গল্পগুজব, গান করে ভালোই সময় কাটলো। এর মাঝে ফলো করলাম উল্লাস ভাই মানুষটা কথা কম বলেন, কিন্তু যা বলেন খুব বুদ্ধিদীপ্ত আর মজা করে বলেন। ফারহানা আপুর কথা জানলাম, ফুল স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে যাচ্ছেন। এভাবেই এর ওর কথা শুনতে শুনতে আমরা যাত্রাবিরতি করলাম চিম্বুকে। সেখানে সকালের নাস্তা করলাম কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ চান্দের গাড়িতে বসে। খুবই মজার খিচুড়ি, মুরগীর মাংস আর সেদ্ধ ডিম। সেখানে আমাদের একটু দেরী হয়ে গেল। নাস্তা করে আবার রওনা হলাম। সাড়ে দশটা নাগাদ পৌঁছালাম থানচি। 

চান্দের গাড়িতে আমরা। ছবি: রাসেল ভাই

থানচি থেকে পরের গন্তব্য রেমাক্রি। এখানে গুগল থেকে ধার করা কিছু তথ্য দিতে চাই। নাফাখুম হচ্ছে একটা জলপ্রপাত। মারমা ভাষায় খুম মানে জলপ্রপাত। আর জলপ্রপাতে সারাবছর পানি পাওয়া যায়। ঝর্ণার মতো বৃষ্টির উপর নির্ভর করে না। বর্ষায় টইটুম্বুর পানি, তবে রঙ দুধ চায়ের মতো, আর শীতে পাওয়া যায় পরিষ্কার-স্বচ্ছ পানি। বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার রেমাক্রি ইউনিয়নে এই জলপ্রপাতটি অবস্থিত। রেমাক্রি একটি মারমা অধ্যুষিত এলাকা। সাঙ্গু নদীর পাড়ে অবস্থিত থানচি বাজার। এই সাঙ্গু নদী ধরে রেমাক্রীর দিকে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে হয় নৌকা বেয়ে। কারণ নদীটি রেমাক্রি হতে থানচির দিকে ঢালু হয়ে এসেছে এবং এই জন্য এখানে অনেক স্রোত থাকে। নদীর কিছুদূর পর পর ১/২ ফুট এমন কি কোথাও ৪/৫ ফুট পর্যন্ত ঢালু হয়ে নিচে নেমেছে। নদীর দুইপাশে উঁচু পাহাড় আছে। কোন কোন পাহাড় এতই উঁচু যে তার চূড়া ঢেকে থাকে মেঘের আস্তরে। সবুজে ঘেরা সে পাহাড়ে মাঝে মাঝে উপজাতি বসতঘর দেখা যায়। রেমাক্রি থেকে তিন ঘণ্টার হাঁটা পথ দূরত্বে নাফাখুম।

মায়াবী সাঙ্গু। ছবি: মাসুম ভাই

আমরা থানচি থেকে নৌকা নিয়ে নিলাম। সাথে ছিলেন গাইড জয় দাদা। যার যার লাইফ জ্যাকেট পরে নিলাম। যাওয়ার দিন মোটামুটি শান্ত সাঙ্গু দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। দুইপাশে রহস্যময় পাহাড়, নদীর স্রোত, পানির নিচের পাথর, হঠাৎ করে ছলকে আসা পানি, সবকিছুই যে কতো ভালো লাগার! রেমাক্রি পর্যন্ত এই জার্নিটা সবাই করতে পারেন। রেমাক্রিতে থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থাও আছে। জীবনে একবার হলেও এই সাঙ্গুর বুকে ঘুরে আসবেন। সবচেয়ে অদ্ভুত লেগেছে আমার কাছে তিন্দু। বিশাল বিশাল পাথর, সবই পাহাড়ধসের সাক্ষী বহন করে। খুব ভালোমতো লক্ষ্য করলে প্রতিটা পাথরের একেকটা রূপ দেখা যায়। যেমন, একটা ছিল একদম হাতির মাথার মতো! এইসব সৃষ্টির সামনে গেলে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি। কতো ক্ষুদ্র আমরা! 

গাইড দাদার সাথে তিন্দুর কোথাও। ছবি: রাসেল ভাই

সবই ঠিক ছিল। নৌকার ইঞ্জিনের শব্দটা ছাড়া! যাইহোক, এক পর্যায়ে সবাই নেমে গেল। রয়ে গেলাম আমি আর বুড়ি নৌকায়। পানি কম ছিল, সবাইকে নিয়ে যাওয়া যেতো না। আমরা দুই হালকা-ফুলকা মা-মেয়েকে নিয়ে নৌকা ভালোভাবেই গেল। বাকিরা আসলো হেঁটে। রেমাক্রি যাওয়ার পথে যেখানে আমাদের নৌকায় রেখে সবাই নেমে গেল, সেখানে তাজিংডংয়ের গাইড উত্তমদার সাথেও দেখা হয়ে গেল। ছবিটবিও তুললাম সবাই মিলে। দেড়টার দিকে রেমাক্রি পৌঁছে খাওয়াদাওয়া করলাম। কিছুক্ষণ পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি করলাম। বড় কয়েকটা পলিথিন নিয়ে নিলাম বৃষ্টি থেকে ব্যাগ বাঁচানোর জন্য। তারপর হাঁটা ধরলাম। বেলা তখন দুইটা। 

রেমাক্রি থেকে এই পথটা ভীষণ সুন্দর। ঝিরিপথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া আরামদায়ক। ঘণ্টা তিনেক ট্র‍্যাকিং এর পর পৌঁছালাম নাফাখুম। এতোদিন শুধু ছবি দেখেছি, এখন চোখের সামনে। নেমে পড়লাম ঝর্ণায়। বৃষ্টি হওয়াতে পানি ঘোলা ছিল। কিন্তু বৃষ্টির জন্যেই পানির সেই তেজ! তেহজীব খুব মজা পাচ্ছিলো। জ্যাকেট পড়ে হাঁসের মতো সাঁতার কাটছিল। আমি ভয়ে কুপোকাত। মাসুম ভাই অনেক চেষ্টা করেও আমাকে সোজা করে ভাসিয়ে রাখতে না পেরে হাল ছেড়ে তেজীর দিকে মন দিলেন। ঘন্টা খানেক পরই আমাদের উঠতে হলো। মূলত আমরা যাবো থুইসাপাড়া, পরদিন আমিয়াখুম যেতে হলে থুইসাপাড়ায় যেয়ে থাকলে সুবিধা। অনেকে আবার নাফাখুম পাড়ায়ও থেকে যান।

এই সেই নাফাখুম। ছবি: শাহীন ভাই

ছয়টা বাজে, সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমরা তাড়াহুড়ো করছিলাম, কারণ কিছু জায়গা আছে বড় বড় বোল্ডার দিয়ে ঘেরা। অন্ধকারে সেই জায়গাগুলো পাড়ি দেয়া ঝামেলার। সমস্যা হয়েও ছিল। অনেককে জোঁকে ধরলো। তিথির পায়ের উপর দিয়ে চিকন একটা সাপ চলে গেল। অন্ধকার জঙ্গলে প্রথম রাতের ট্র‍্যাকিং আমাদের। সেই একটা অভিজ্ঞতা! এদিকে মুশতাক পুরো সময়টা আমার সাথে ছিল। আর তেহজীবের দেখাশোনার সম্পূর্ণ ভার নিজেদের উপর নিয়েছিলেন মাসুম ভাই আর রাসেল ভাই। এই দুইজন মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। সারাদিনের ট্র‍্যাকিংয়ের পর ক্লান্ত পরিশ্রান্ত, প্রায় ঘুমিয়ে যাচ্ছে এমন বাচ্চাকে নিয়ে অন্ধকার পথে নিজেকে সামলে ট্র‍্যাকিং করা চাট্টিখানি কথা না। আমরা নিশ্চিন্তেই ছিলাম। মাঝেমাঝে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। খোলা মাঠ, আকাশে তারার মেলা, নীচে জোনাকির আলো। জীবন সার্থক হয়ে যায়! 

রাত নয়টা বাজে, তখন আমরা পৌঁছালাম জিন্নাপাড়া। জমজমাট পাড়া। সবাই বলে জিন্নাপাড়া নাকি সুন্দর বেশি। আমিয়াখুম যাবেন এমন অনেক গ্রুপ এই পাড়াতেও ছিলেন। একজন বলছিলেন, সেদিন নাকি আমিয়াখুমে অনেক বৃষ্টি হয়েছিল। ওনারা সেদিন যেতে পারেন নাই। এদিকে আমাদের পা তো আর চলে না। কিন্তু উঠতে হলো। থুইসাপাড়া আরেকটু দূরে। দশটা নাগাদ যেয়ে পৌঁছালাম আমরা। এখানেও মানুষের মেলা। ঈদের ছুটি হওয়াতে অনেক গ্রুপই ছিল। একজন বললেন, পাড়ায় প্রায় ২০০ মানুষ আসছে।

থুইসা দাদার ঘরের সিঁড়িতে। ছবি: ফারাবী ভাই

আমরা উঠলাম থুইসা দাদার ঘরেই। আমার ঘুমন্ত মেয়েটাকে দেখি যত্ন করে শুইয়ে দিয়েছে তার চাচ্চুরা। রাতে জুমের ভাত, মুরগী, ডাল আর মাসুম ভাইদের আচার দিয়ে উদরপূর্তি করে শুতে গেলাম। কাঠের মেঝেতে পাটি, মাথার নীচে একটা বালিশ, পাতলা একটা কম্বল, ঘরের জানালা দিয়ে হালকা হালকা বাতাস। সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা নিয়ে যে ঘুমটা হলো, সারাজীবন নরম বিছানায় আরামে শুয়েও এতো ভালো ঘুম হয়েছে কিনা সন্দেহ! 

আমরা গিয়েছিলাম Hit the Trail এর সাথে। তাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দিয়ে দিচ্ছি।

https://www.facebook.com/groups/HitTheTrailBd/

মাসুম ভাই: 01672970714

রিফাত ভাই: 01931800139

রাসেল ভাই: 01873340122

বিঃদ্রঃ ঘুরতে যেয়ে আমরা জায়গা নোংরা করি না। দেশটা আমাদের। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদেরই দায়িত্ব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here