আগে থেকেই জানতাম ফুল দেখতে হলে যেতে হবে ১৪ ফেব্রুয়ারির আগে। ১৩-১৪-২১ ফেব্রুয়ারি, এ তিনদিনেই বিক্রি হয়ে যায় প্রায় সব ফুল। এদিকে আবার ফুলের বাজার বসে ভোররাত থেকে সকাল ৭-৭:৩০ টা পর্যন্ত। এসব হিসেব নিকেশ করে দেখলাম যেতে হলে আগের দিন যেয়ে গদখালি থেকে ভোরে উঠে ফুলের বাজার দেখতে পারলে ভাল হয়। কিন্তু থাকবো কোথায়? গদখালিতে তো থাকার মতো কোন জায়গা নেই। টিওবির অনেক পুরণো সদস্য হাসান ভাইকে একটা ফোন দিলাম, কিছু করা যায় কিনা।

রাতে ফুলের ক্ষেতে ক্যাম্পিং। ছবি: লেখক

তিনি তার এক বন্ধুর সাথে কথা বলে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন নারাংগালি গ্রামে। খুলনা থেকে গদখালির নারাংগালি গ্রামের দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। বিশাল কোন ব্যপার না, সমস্যা হচ্ছে রাইড শুরু করতে হবে বিকেল ৫ টায় অফিস শেষ করার পর। আমাদের হোস্ট রাশেদ ভাই ফোনে জানালেন যত রাতই হোক কোন সমস্যা না, আমরা এসে পৌঁছালেই হবে।

সোনাডাংগা থেকে আমরা যাত্রা শুরু করলাম ঠিক বিকেল ৫ টায়। সাতজনের মধ্যে চারজন, বাকি তিনজন আমাদেরকে চুকনগরে যেয়ে ধরবে। চুকনগর পর্যন্ত রাস্তা কয়েক কিলোমিটার ভাংগা বাদে বাকিটা চমৎকার। প্রথম ৩৫ কিলোমিটার শেষ করে চুকনগরে যখন থামলাম, বাকিরা আমাদের ধরে ফেললো। এবার সবাই মিলে যাত্রা শুরু করলাম। এত সুন্দর আবহাওয়া, মনে হচ্ছে পুরো রাস্তায় এসি লাগানো। এরকম রাতে পুরো রাতই রাইড করা যায়। 

গ্লাডিওলাস ফুলের ক্ষেত। ছবি: লেখক

রাত ৯ টার দিকে আমরা ডিনার সারলাম একটা ছোট্ট বাজারে। আবার যখন শুরু করলাম, রাশেদ ভাইয়ের ফোন, আমাদের অবস্থান শুনে বললেন এখনও অনেক সময় লাগবে। শুনে গতি বেড়ে গেল আমাদের। ঝড়ের বেগে নারাংগালি গ্রামে যখন পৌঁছালাম তখন রাত সাড়ে দশটার একটু বেশি। রাশেদ ভাই একটু অবাকই হলেন আমাদের দেখে, উনার ধারণা ছিল রাত ১২ টা বাজবে অন্তত।

আমদেরকে নিয়ে গেলেন মাঠে। প্রথমে অবশ্য উনার বাসায় থাকতে বলেছিলেন, আমরা ক্যাম্পিং করতে চাই জেনে মাঠেই নিয়ে গেলেন। মাঠটা খালি, তাই থাকতে কোন সমস্যা নেই। শুধু সাপ একটু ঝামেলা করে, আমি বললাম শীতকালে তাদের দেখা পাওয়া কঠিন। উনাকে বিদায় দিয়ে আমার তাড়াতাড়ি করে তাঁবু গেড়ে শুয়ে পড়লাম। ভোরে আজান দেয়ার পরই উঠে পড়লাম। ‍কুয়াশাঢাকা চমৎকার পরিবেশ চারদিকে। পাশের বনে প্রাকৃতিক কাজ ও পুকুরে হাতমুখ ধুয়ে সবকিছু গুছিয়ে সাইকেলে বেঁধে আবার রওনা দিলাম।

বাজারে বিক্রি হচ্ছে ফুল। ছবি: লেখক

রাশেদ ভাই আমাদের জন্য রসের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। রস আর মুড়ি দিয়ে নাস্তা করেই আমার ফুলের গ্রামের মধ্য দিয়ে রওনা দিলাম বাজার দেখতে। জমজমাট বাজার। গ্রাম থেকে ভ্যান, সাইকেল, মোটরাসাইকেলে করে আসছে ফুল। ক্রেতারা দাম হাকাচ্ছেন আর বিক্রেতারা বিক্রি করছেন। হরেক রকমের ফুল। তবে গ্লাডিওলাস, জারবেরা, গোলাপ, গাদা আর রজনীগন্ধাই বেশি। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এ সময়টাতে ফুলের দাম সর্বোচ্চ থাকে। যে গোলাপ প্রতি ১০০ টি ৫০ টাকায় বিক্রি হয়, এসময় সেটা ১১০০-১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আমার পছন্দের ফুল জারবেরা। মান অনুসারে জারবেরা বিক্রি হচ্ছিল ৫ থেকে ১৫ টাকায়। এক গাদা কিনে নিলাম স্ত্রীর জন্য। দেখা শেষ করে বিক্রমপুর হোটেলে ভালোমতো নাস্তা করে রওনা দিলাম খুলনার দিকে।

পুরো ট্রিপের ভিডিও

দুপুর ১২ টার দিকে রওনা দিয়ে সন্ধ্যার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে খুলনা ঢুকলাম। ৯০+৯০=১৮০ কিমি সাইক্লিং আর রাতে ক্যাম্পিং মিলে মনে রাখার মতো একটা রাইড হয়ে গেলো। 
পুরো ট্রিপে আমরা আমাদের দ্বারা যাতে পরিবেশের কোন ক্ষতি না হয় সেটা লক্ষ্য রেখেছি, আপনারও সেটা অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন।

ফিচার ছবি লেখক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here