Breaking News

বিদেশি পর্যটক টানার স্বপ্ন ও বাস্তবতা: পর্যটন দিবসের ভাবনা ২০২২

কিছুদিন আগে রাঁধুনী গুড়ো মশলার ব্র‌্যান্ডের আর্থিক সহায়তায় গুণী চলচ্চিত্রকার মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর তৈরী করা ভিডিও নিয়ে অনেক আবেগ উচ্ছাস দেখলাম। ভিডিওতে লরা নামের একজন বিদেশি নারী পর্যটক দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। পুরো ভিডিওর নির্মাণশৈলী প্রশংসার দাবীদার, সেই সাথে দেশের পর্যটনকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার প্রয়াসটাও খুব সুন্দর।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে আদৌ কী আমরা বিশ্ব পর্যটক টানার মতো অবস্থায় আছি? ভিডিওটা দেখে আমার একটা পুরণো গল্প মনে পড়ে গেলো। এক ব্যক্তির পাপ-পূণ্য সমান হয়ে যাওয়ায় তাকে স্বর্গে না নরকে দিবে সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না বিধাতা। তাই তাকে বিজ্ঞাপণ দেখানোর জন্য আদেশ দিলেন তিনি। প্রথমে তাকে স্বর্গে নিয়ে যাওয়া হলো, শান্ত নীরব স্বর্গটা সেই ব্যক্তির ঠিক পছন্দ হচ্ছিলোনা। তাই সে নরক দেখতে চাইলো। সেখানে যেয়ে পরিচিত অনেককেই দেখতে পেলো, নামী-দামী তারকাদেরও দেখা যাচ্ছে দেখে সে নরকেই থাকার ইচ্ছা পোষণ করলো। সাথে সাথে তাকে নরকে ছুড়ে মারা হলো। আগুনে পুড়তে পুড়তে সে বললো, তোমরাতো আমাকে আগুন দেখাওনি, উত্তর পেলো “তোমাকে তো বিজ্ঞাপণ দেখানে হয়েছে!”

বিজ্ঞাপণটি শুরু হয়েছে বান্দরবানের দৃশ্য দিয়ে। অথচ বান্দরবানে কোন পর্যটক যেতে দরকার পড়ে আলাদা অনুমতির! ছবি রাধুনীর ফেইসবুক পেইজ থেকে

কেন এই গল্প বললাম? ভিডিওর শুরুতে বান্দরবানের দেবতাখুমে একটা অংশ দেখা যায়, যেখানে লরা তার বাংলাদেশি বান্ধবীর সাথে বাঁশের ভেলায় খুমে ভেসে বেড়াচ্ছো। পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য নি:সন্দেহে খুব সুন্দর একটি দৃশ্য। এখন কল্পণা করুন আপনার পরিচিত কোন বিদেশি বস এ ভিডিও দেখে আপনার সাথে বান্দরবানে কোথাও যেতে চাইলো, তারপর আপনার অবস্থাটা কী হবে? এই পর্যটককে বান্দরবান নেবার জন্য আপনার দৌড়াদৌড়ি করতে হবে কতগুলো জায়গায়!

বাংলাদেশি আথিতেয়তা জিনিসটা খুব বেশি দেখানো হয়েছে। একথা সত্য যে এখনো দেশের অনেকলোক এধরণের আথিতেয়তা দিবে, কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে পর্যটন এলাকায় কোন বিদেশি পর্যটক এধরণের আথিতেয়তা পাবার চেয়ে উল্টোটা হবার সম্ভবনাই বেশি। সাদা চামড়া দেখে নগদে ৫০ টাকার ভাড়া ৩০০ টাকা দাবী করার ঘটনা নিজের চোখেই দেখেছি। আর ভাংগা ইংরেজিতে ডলার চাওয়া ভিক্ষুক ও অযথা ভিড় করা অতি উৎসাহী জনতার কথা বাদই দিলাম।

বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণের শীর্ষে আছে সুন্দরবন। আর এজন্য সুন্দরবনের প্রবেশ ফি বাড়িয়েই চলেছে বন বিভাগ। ছবি হাসনাত কিরণ

প্রসংগত আরেকটা বিষয়ও আনতে হয় এখানে। বাংলাদেশে প্রতিটি পর্যটন গন্তব্যে বিদেশি পর্যটকের জন্য ১০ গুণ প্রবেশ ফি ধরা আছে। সুন্দরবনের ক্ষেত্রে অংকটা আরো বেশি। এটা ঠিক যে পৃথিবীর অনেক দেশেই বিদেশিদের জন্য এ ধরণের উচ্চ প্রবেশ ফি প্রচলিত, আদৌ কী আমরা সে অবস্থানে আছি? বরং অতি সামান্য বিদেশি পর্যটকের কাছ থেকে আর্থিক যে লাভ হচ্ছে সেটার চেয়ে দেশীয় পর্যটকের সমান প্রবেশ ফি রেখে সেটাকে প্রচার করার সুযোগটাই বেশি কাজে লাগানো দরকার।

তাহলে বাংলাদেশে কী বিদেশি পর্যটকে টানার সম্ভাবনা কি নেই? এর উত্তর হচ্ছে অবশ্যই আছে, তবে সেটার জন্য অনেক প্রস্তুতি দরকার। পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেই বিদেশি পর্যটক সবচেয়ে কম। এর পেছনে অনেক কারণ আছে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা না করে মূল পয়েন্টে যাই। বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকদের টানার কাজটা অসাধারণভাবে করতে পেরেছিলেন একজন, তিনি ছিলেন মাহমুদ হাসান খান।

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন বিষয়ক বই লোনলি প্ল্যানেট মাহমুদ ভাইকে বাংলাদেশে আসা পর্যটকদের “গার্ডিয়ান এঞ্জেল” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি অকালে মৃত্যুবরণ না করলে হয়তো বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক আসার গতি বাড়তে পারতো। ট্রিপএডভাইজর ও লোনলি প্ল্যানেটে মাহমুদ ভাই সবসময় বিভিন্ন পর্যটকদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সহায়তা করতেন এবং বিদেশি পর্যটকরা পছন্দ করতে পারে এমন সব ভ্রমণ পরিকল্পণা দিতেন।

বিদেশী পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে টাংগুয়ার হাওর। ছবি প্রকৃতিযাত্রী

আমার কাছে মনে হয় বিদেশি পর্যটকরা কী কী পছন্দ করতে পারে, সেটাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের চারপাশ ঘিরে আছে ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমারের মত জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। বাংলাদেশে আসাটা পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশ কীভাবে এদের চেয়ে ভিন্ন এটা প্রমাণ না করতে পারলে পর্যটক টানা খুব কঠিন ব্যপারই। তবে আশার কথা হচ্ছে দেশের মানুষই এখন অনেক ঘোরাঘুরি করছে, আর তাদের সহযোগিতা করছে  ফেইসবুক ভিত্তিক ট্রাভেল গ্রুপগুলো। এদেরকে নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই কিন্তু বিদেশি পর্যটক টানা সম্ভব। কীভাবে সেটা এবার আলোচনা করা যাক:

সঠিক ব্র‌্যান্ডিং: পর্যটনের জন্য করা ভিডিও, ব্লগ, ওয়েবসাইটে বাংলাদেশে  বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভিন্ন কী কী আছে এবং সেখানে তারা সহজেই যেতে পারবে এরকম বিষয়গুলোকে বেশি দেখাতে হবে। যেমন বন্ধ হয়ে যাওয়া ১০০ বছরের পুরণো প্যাডেল স্টিমারে ভ্রমণ যেটা পৃথিবীর আর কোন দেশে নেই, শুধু পর্যটকদের জন্য অন্তত প্রতিমাসে একটি করে ট্রিপ রাখা যায় এ জাহাজের। একই রকমভাবে আছে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, ভাসমান পেয়ারা বাজার।

পার্বত্য চট্টগ্রামে যেহেতু বিদেশিদের নিয়ে যেতে ঝামেলা, তারা সহজে যেতে পারবে এরকম জায়গা জলপ্রপাত দেখানো যেতে পারে (যেমন সীতাকুন্ড রেঞ্জের ঝর্ণা, হাম হাম ঝর্ণা এরকম)। এছাড়া বাংলাদেশের জলাভূমিগুলোও পর্যটক টানতে পারে, এগুলোর সঠিক প্রচারণা দরকার। ইহিতাস ও ঐতিহ্যের সংমিশ্রণেও হতে পারে ব্র‌্যান্ডিং।

সঠিক তথ্য ও গাইডিং: বিদেশি পর্যটকদের দরকার সঠিক তথ্য, আরো ভালো হয় সংগে কেউ যেতে পারলে। ট্রাভেল গ্রুপগুলো ঠিক একাজটাই করে যাচ্ছে। দেশের ট্রাভেলগ্রুপলো যারা চালাচ্ছে, তারা সবাই শিক্ষিত এবং সহজেই বিদেশি পর্যটককে সঙ্গ দেবার যোগ্যতা রাখে। প্রতিটি ট্রিপেই এডমিন/মডদের কেউ সংগেই যাচ্ছে। এই গ্রুপগুলো সহজেই বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যেতে পারবে, পর্যটকরাও বন্ধু ও নিরাপত্তা পাবে। তবে গণহারে সব গ্রুপগুলোকে এ সুযোগ না দিয়ে বাছাই করে ভালো কিছু গ্রুপকে দিতে হবে এ সুযোগ।

বাজেট ট্রাভেলারদের কথা মাথায় রেখে সাজাতে হবে দেশের পর্যটন ছবি দহলিজ

খরচ কমানো: বিদেশি পর্যটক মাত্রই টাকার খনি, তারা সবচেয়ে বেশি খরচ করবে এ ধারণা খুব ভুল।  এশিয়ায় বেড়াতে পর্যটকদের একটি বড় অংশই বাজেট ট্রাভেলার, যারা খুব হিসাব করে খরচ করবে। তাদের জন্য কিছু সুযোগ সুবিধাও দরকার। যেমন এয়ারপোর্টের কাছাকাছি কোথাও নিরাপদ ও কম খরচের হোটেল/হোস্টেল দরকার। এছাড়া গ্রুপগুলোর সাথে মিশে ভ্রমণ করলে তারা খরচ কমাতে পারবে। বিভিন্ন ভ্রমণ গন্তব্যে বিদেশি পর্যটকদের জন্য  আলাদা প্রবেশি ফির বিষয়টা অন্তত ১০ বছরের জন্য বাদ দেয়া দরকার।

ইভেন্ট: পর্যটক টানার জন্য বিভিন্ন ধরণের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক বা অংশগ্রহণমূলক ইভেন্টের আয়োজন করা যেতে পারে। যেমন মাউন্টেইন বাইকিং (পর্বতে সাইক্লিং), ম্যারাথন, ওপেন ওয়াটার সুইমিং, বিচ কার্ণিভাল। বর্তমানে বাংলাদেশে খুব সীমিত পরিসরে এসব ইভেন্ট হচ্ছে। যেগুলো হচ্ছে সেগুলোতেও বিদেশিদের অংশগ্রহণ খুবই কম। ইভেন্টগুলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচার প্রচারণা দরকার।

বাংলা চ্যানেল সাঁতারের মতো আরও ইভেন্ট প্রয়োজন। ছবি রাসেল

সোশ্যাল মিডিয়া: দূর্ভাগ্যজনকভাবে  এখনও বাংলাদেশে যে সমস্ত পর্যটকরা আসে তারা  এ দেশের নেতিবাচক দিকগুলোই বেশি প্রচার করে। যেমন বিপজ্জনকভাবে বাস চালানো, পর্যটকদের পেছনে অনেক মানুষ অনুসরণ করছে এ ধরণের। সারা পৃথিবীতে অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার আছে যারা ইতিবাচকভাবে দেশকে তুলে ধরতে পারবে, তাদেরকে নিমন্ত্রণ জানানো যায়। এছাড়া দেশেও অনেক ব্লগার/ইউটিবার আছে যারা চাইলে বিদেশিদের আকর্ষণ করতে পারে এ ধরণের কনটেন্ট তৈরী করতে পারবে। প্রয়োজনে প্রতিযোগিতার আয়োজন করে তাদের মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরী করে সেগুলো প্রচার করা যেতে পারে।

কমিউনিটি ট্যুরিজম: বাংলাদেশের প্রতিবেশী প্রায় সব দেশেই তুমুল জনপ্রিয় কমিউনিটি ট্যুরিজম। এ জায়গায় বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে অনেক। সীমিত পরিসরে চালু হওয়া কমিউনিটি ট্যুরিজমের বেশিরভাগই বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো কিছু টিকে আছে  এবং চমৎকার ব্যবসাও করছে। নতুন নতুন জায়গায় কমিউনিটি ইকো ট্যুরিজম চালু করে সেখানকার অধিবাসীদের সংযুক্ত করতে পারলে অনেকটাই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

শেষ করবো সাম্প্রতিক সময়ে  এক বাংলাদেশী দম্পতির শ্রীলংকা ভ্রমণ নিয়ে। জুনায়েদ ও ভিউ শ্রীলংকা যখন অবতরণ করে তখন দেশটি দেউলিয়া হয়ে গেছে,  জ্বালানি ও বিদ্যু সংকট, পেট্রোল পাম্পে বিশাল লাইন। কিন্তু পর্যটকবাহী গাড়ি শুনে তাদের গাড়ীকেই সবার আগে এবং কোটার চেয়ে বেশি তেল দিয়েছে। মাত্র দুজনের জন্য বিরাট রিসোর্ট চালু রেখেছে। তাই অবস্থা যেমনই হোক, থেমে নেই দেশটির পর্যটন। হয়তো কিছুদিন পরে ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়াবে তারা। পর্যটক টানতে আমাদেরকে এরকম ডেডিকেশন দেখাতে হবে।

ফিচার ছবি শাহীন কামাল

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে আমা-দাবলামের শীর্ষে বাবর আলী

পেশায় ডাক্তার, আর নেশায় পাহাড়ি, নিজেকে এভাবেই পরিচয় দিতে পছন্দ করেন বাবর আলী। একেধারে সাইক্লিস্ট, …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *