বাংলাদেশে সাইক্লিং জনপ্রিয় সারা দেশেই। তবে শহরগুলোতে খুব কম মানুষকে নিয়মিত সাইকেল চালাতে দেখা যেতো। এ অবস্থার পরিবর্তন আনতে মাঠে নেমেছিলো ফেইসবুক ভিত্তিক দেশের বৃহত্তম সাইক্লিং সংগঠন বিডিসাইক্লিস্টস। গত দশ বছরে সাইক্লিংকে জনপ্রিয় করতে অনেক কিছুই করেছে সংগঠনটি। এর মধ্যেই বিডিসাইক্লিস্টসের রেসিং শাখা টিমবিডিসির সদস্য প্রভাত চৌধুরী চালিয়ে ফেলেছেন ১,০০,০০০ কিমি!

সাইক্লিং সহ সব আউটডোর একটিভিটিজের হিসেব রাখার জন্য পৃথিবীব্যাপী জনপ্রিয় অ্যাপ স্ট্রাভা। প্রভাত ২০১৩ সালে সাইক্লিং শুরু করে ৯ বছর নিয়মিত চালিয়ে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে এক লক্ষ কিমি সাইক্লিংয়ের অনন্য মাইলফলক স্থাপণ করতে পেরেছে। ৯২,০০০ কিমি চালিয়ে স্ট্রাভায় বাংলাদেশীদের মধ্যে ২য় অবস্থানে আছেন আমিনুল ইসলাম। আপাতত ধারে-কাছে অন্য কেউ নেই এই অভিনব রেকর্ডের।

আরো অনেকের মতো বিডিসাইক্লিস্টসের অনুপ্রেরণায় সাইক্লিং শুরু করেন প্রভাত। মূলত অফিস যাওয়ার জন্য সাইক্লিং শুরু করলেও আস্তে আস্তে টিমবিডিসির সাথে নিয়মিত অনুশীলনও শুরু করেন। সে সময় বিডিসাইক্লিস্টসের নিয়মিত আয়োজন ছিলো মন্ডো চ্যালেঞ্জ। এতে প্রতি মাসে সবচেয়ে বেশি কে সাইকেল চালিয়েছে সেই তালিকা প্রকাশ করা হতো। সবচেয়ে বেশি চালানে তিন জনকে উপহারও দেয়া হতো।
মূলত এই মন্ডো চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণ করতে যেয়েই নিজের সাইক্লিংয়ে তথ্য অ্যাপে আপলোড করা শুরু করেন প্রভাত। মন্ডোর লীডবোর্ডে নিজেকে দেখে বা কাউকে অতিক্রম করতে দেখে আবার তাকে পেছনে ফেলা এসব বিষয়গুলো ভালো লাগতে শুরু করে তার। তাই বাসা থেকেই সাইকেল নিয়ে বের হলেই সেই তথ্য আপলোড করতেন তিনি। এক সময় পুরো ব্যপারটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আধা কিলোমিটার চালালেও রেকর্ড করে রাখতে ভুলতেননা।
কখনো এভাবে এক লক্ষ কিলোমিটার চালিয়ে ফেলবেন ভাবেননি তিনি। ভ্রমণগুরুর সাথে সাক্ষাৎকারে তাই জানালেন। তবে এই যানজটে পিষ্ঠ ঢাকা শহরে সাইক্লিংটাই তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠে। জ্যাম এড়ানো যাচ্ছে, সেই সাথে সূস্থ্য একটা জীবনযাপন পদ্ধতি পেয়েছেন, সে সুযোগটাই কাজে লাগাতে চেয়েছেন তিনি। আর তাই সাইক্লিং হয়ে উঠে প্রভাতের সবচেয়ে বড় বিনোদন। কাউকে সঙ্গে না পেলে অনেক সময় একাই নেমে পড়েন হাতিরঝিলে, সকাল সকাল না থেমেই ১০০ কিমি চালিয়ে তবেই নাস্তা করতে বসেন।

সাইক্লিংয়ের পাশাপাশিও দৌড়ানোও তার পছন্দের। বেশ কয়েকটি ম্যারাথন ইভেন্টে প্রথম দশের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন তিনি। ডুয়াথলনে বরাবরই আধিপত্য বিস্তার করেছেন, চ্যাম্পিয়ন-রানার্সআপ হয়েছেন কয়েকটি ইভেন্টে। এবছর জাতীয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতার একটি ইভেন্টে পঞ্চম স্থান পেয়েছেন। ট্যুর ডি বাংলাদেশের ২০১৭ সালের ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্যও ছিলেন তিনি।
সাইক্লিং ও রানিংয়ে থাকতে থাকতে ঢুকে গেছেন গিনেজ রেকর্ডের পাতায়ও। তাও আবার একবার নয়, মোট তিনবার। গত বছরই টিমবিডিসির দলগত ৪৮ ঘন্টায় রিলে পদ্ধতিতে চালিয়ে ১,৬৭০ কিমি চালানোর গিনেজ রেকর্ডে প্রভাতও ছিলেন মূল চারজন রাইডারদের সহকারী হিসেবে। এছাড়া ২০১৬ সালে বিডিসাইক্লিস্টসের গড়া সিংগেল লাইন সাইক্লিয়ের গিনেজ রেকর্ড দলের সদস্যও ছিলেন তিনি। তার গিনেজের অন্য রেকর্ডটি রানিংয়ের।

সাইক্লিস্টসদের জনপ্রিয় সংগঠন বিডিসাইক্লিস্টসের অন্যতম একজন ভলেন্টিয়ার তিনি। এই গ্রুপটি প্রতি শুক্রবার নতুন যারা সাইকেল চালায় তাদের জন্য বাইক ফ্রাইডে আয়োজন করেন। এছাড়া তাদেরই শাখা টিমবিডিসি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশে ও দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিযোগিতায় নামার জন্য দক্ষ সাইক্লিস্ট তৈরীতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কোন শুক্রবার সকালে হয়তো আপনার চোখে পড়েছে একদল সাইক্লিস্টস ঝড়ের বেগে হাতিরঝিলে দলগতাভাবে চালিয়ে অনুশীলন করছে।
প্রভাতকে স্ট্রাভা অ্যাপে ফলো করতে পারেন এই লিংকে। আর তার ফেইসবুক পেইজ এই লিংকে পাবেন। টিমবিডিসিতে যোগ দিতে বা তাদের ফলো করতে চাইলে ফলো করতে পারেন এই লিংকে।
প্রভাতের অর্জনে খুশি বিডিসাইক্লিস্টসের সংগঠক ও সদস্যরা। গ্রুপটির অন্যতম প্রধান সংগঠক ফুয়াদ আহসান চৌধুরী জানান বিদেশের সাথে প্রভাতের অর্জনকে তুলনা করা উচিত হবেনা। দেশে সাইকেল চালানো অনেক কঠিন ব্যপার এবং সেখানে ১,০০,০০০ কিমি কেউ এত অল্প সময়ের মধ্যে চালাতে পারবে সেটা আসলেই ধারণা বাইরে তাদের। প্রভাতের অর্জন নি:সন্দেহে বাকি সাইক্লিস্টসদেরও অনুপ্রাণিত করবে। এছাড়া খুব তাড়াতাড়ি বিডিসাইক্লিস্টস এ অর্জনকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে বলেও তিনি জানান।

প্রভাতের অর্জন নিয়ে যখন সাইক্লিং গ্রুপ ও সাইক্লিস্টরা উল্লাসিত, এর কিছুদিন আগে বিডিসাইক্লিস্টস ছুয়ে ফেলেছে আরেকটি মাইলফলক। ৫ই অগাস্ট ২০২২ সংগঠনটি উদযাপন করেছে তাদের ৪০০ তম বাইক ফ্রাইডে। মূলত নতুনদের মধ্যে সাইক্লিংয়ে আগ্রহ বাড়াতে প্রতি শুক্রবার বিডিসাইক্লিস্টস ২০১২ সাল থেকে আয়োজন করে যাচ্ছে শুক্রবার সকালবেলার এ রাইড। গ্রুপটি অভিজ্ঞ স্বেচ্ছাসেবকরা পথ প্রদর্শন করে সবাইকে নিয়ে ঢাকার আশেপাশে ঘুরে আসেন ২০-৩০ কিলোমিটার।

২০২০ সালে করোনার কারণে অনেকদিন বন্ধ থাকার পর ২০২১ সালে আবার শুরু হয় বাইক ফ্রাইডে। ৪০০ তম বাইক ফ্রাইডে স্মরণীয় করে রাখতে ঢাকার অদূরে মুন্সীগঞ্জের পদ্মহেমে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তারা। এ রাইডে যোগ দিতে সারা দেশ থেকে অন্তত ৫০০ সাইক্লিস্ট এসে হাজির হন পদ্মহেমে। এছাড়া সাইকেল ছাড়াও অন্যান্য যানবাহন নিয়ে আসেন আরো ৩০০ জন। এ উপলক্ষ্যে স্যুভেনির হিসেবে একটি টিশার্টও বের করা হয়।
আপনি যদি সাইক্লিংয়ে আগ্রহী হয়ে থাকেন তাহলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ, সঙ্গী অথবা সাইক্লিং বিষয়ক বিভিন্ন কিছু জানতে যোগ দিতে পারেন বিডিসাইক্লিস্টসের ফেইসবুক গ্রুপে।
ফিচার ছবি: বিডিসাইক্লিস্টস থেকে সংগৃহীত
ভ্রমনগুরু your travel adviser