বিশ্বের ২য় সর্বোচ্চ পর্বত কেটুর সামিট করলেন ওয়াসফিয়া নাজরীন

পাকিস্তানে অবস্থিত বিশ্বের ২য় সর্বোচ্চ পর্বত কেটু, যার উচ্চতা ৮,৬১১ মিটার (২৮,২৫১ ফিট)। দেশটির আজাদ কাশ্মীর ও চীনের জিনজিয়ান সীমান্তবর্তী কারাকোরাম অঞ্চলে এর অবস্থান। উচ্চতায় ২য় হলেও পর্বতারোহীদের মৃত্যুর রেকর্ডের কারণে এ পর্বতকে “Savage Mountain” বা ”আদিম পর্বত” ও বলা হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে অন্নপূর্ণা ১ পর্বতে (৩২%), তারপরই অবস্থান কেটুর (২৯%)।

প্রথম বাংলাদেশী পর্বতারোহী হিসেবে সেই কেটু শীর্ষে পৌছালেন ওয়াসফিয়া নাজরীন।  ২২ জুলাই ২০২২ পাকিস্তান সময় সকাল ৮:৫৫ মিনি তিনি এ পর্বতের শীর্ষবিন্দুতে পৌছান। পর্বতারোহী ওয়াসফিয়া এর আগে মাউন্ট এভারেস্ট সহ পৃথিবীর সাত মহাদেশে অবস্থিত সাতটি সর্বোচ্চ পর্বতে আরোহণ করে “সেভন সামিট” সম্পন্ন করার গৌরব অর্জন। এছাড়া ২০১৬ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি তাকে বর্ষসেরা “Emerging Explorer” ঘোষণা করেছিলো। ওয়াসফিয়ার এ অভিযানের স্পন্সর ছিলেন রেনেটা বাংলাদেশ।

কেটুর শীর্ষ বিন্দুতে বাংলাদেশের পতাকা হাতে ওয়াসফিয়া ছবি ফেইসবুক থেকে

গত ১৫ জুন ওয়াসফিয়া সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত পর্বতারোহী নির্মল পূর্জার (নিমসদাই) নেতৃত্বে পরিচালিত এজেন্সী “এলিট এক্সপিড” এর সাথে স্কার্দু শহরে পৌছান। বারো জনের এ দলটির নের্তৃত্ব দিচ্ছেন মিংমা তেনজি শেরপা। ওয়াসফিয়া সহ বিভিন্ন দেশে আরো ৬ জন নারী পর্বতারোহী রয়েছেন তাদের দলে। বেইজ ক্যাম্পে পৌছালোও ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন তারা। গত ১৭ জুলাই ওয়াসফিয়া তার ফেইসবুক পেইজের মাধ্যমে জানান তারা উপরে উঠতে শুরু করছেন এবং সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে এক সপ্তাহের মধ্যে একটি ভলো সংবাদ পেতে যাচ্ছেন সবাই।

এরপর গত ২১ জুলাই অনেক চেষ্টার পর শেরপা দলের পাঁচ জন কেটুর চূড়ায় রোপ স্থাপন করতে সক্ষম হন। এরপর থেকেই শুরু হয় চলতি সামার মৌসুমের সামিট। প্রথম দিনই বিশ্বের নামকরা পর্বতরাহেীরা কেটু সামিট করতে সক্ষম হন। এর মধ্যে রয়েছে আলোচিত পর্বতারোহী ক্রিস্টিন হ্যারিলা, যিনি কিনা নির্মল পূর্জার করা সবচেয়ে কম সময়ে ১৪ টি ৮,০০০ মিটারের বেশি উঁচু পর্বত সামিটের রেকর্ড ভাঙ্গার পথে আছেন। সামিট শেষে ২৩ জুলাই রাত ১০:৫৫ মিনিটে বেইজ ক্যাম্পে ফিরে আসেন ওয়াসফিয়া সহ এলিট এক্সপেডের সকল সদস্য।

ওয়াসফিয়াকে গাইড করেছেন সবচেয়ে কম সময়ে ১৪ টি ৮,০০০ মিটার পর্বত সামিটের রেকর্ড গড়া নির্মল পূর্জা ছবি ফেইসবুক থেকে

পাকিস্তানের এই পর্বতকে স্থানীয় ভাষা চোগোরি বলা হয়। ১৮৫৬ সালে ভারত সার্ভের সময় এ পর্বত আবিস্কার করেন কর্ণেল টি জি মন্টগমোরি। কেটু নামকরণ হয়েছিলো কারাকোরাম পর্বতশ্রেণীতে সার্ভে করা ২য় পর্বত বুঝানোর জন্য। এছাড়া প্রথম বৃটিশ সার্ভেয়ার গডউইন অস্টিনের নাম অনুসারে এ পর্বতকে মাউন্ট গডউইন অস্টিন বলেও ডাকা হয়। ১৯০২ সাল থেকে একের পর এক এ পর্বতারোহণের চেষ্টা ব্যর্থ হতে থাকে।

অবশেষে ১৯৫৪ সালে ইতালিয়ান একটি দল আরদিতো দেসিওর নের্তৃত্বে ৩১ জুলাই সন্ধ্যা ৬ টায় প্রথমবারের মতো এ পর্বতে শীর্ষে আরোহণ করতে পারেন। তবে সেই দলের গাইড মারিও পুচোজ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যবরণ করেন। এরপর থেকে কেটুতে সামিট হলেও মৃত্যুহারের দিক বিবেচনায় অন্যতম ভয়ংকর পর্বত হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে আসছিলো। এছাড়া শীতকালে এ পর্বতারোহন বলতে গেলে অসম্ভবই মনে হচ্ছিলো।

কেটু বেইজ ক্যাম্পে ওয়াসফিয়া ফাইল ফটো

কিন্তু গতবছর নেপালী শেরপাদের দলের সাথে একজোট হয়ে নির্মল পূর্জার নের্তৃত্বে এই অসম্ভবকে সম্ভব করে ১৬ জানুয়ারী ২০২১ পাকিস্তানের সময় বিকেল ৫ টায় প্রথমবারের শীতকালীন কেটু সামিট সম্ভব হয়। ওয়াসফিয়াদের কেটু ও ব্রড পিক সামিটের নের্তৃত্ব দেয়া মিংমা তেনজিং শেরপাও এই ইতিহাস সৃষ্টি করা দলের সদস্য ছিলেন। শীতকালীন কেটু পর্বতের অভিযান একদিকে যেমন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে অন্যদিকে বাঘা বাঘা সব পর্বতারোহীর মৃত্যুর জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শীতকালীন সামিটের চেষ্টায় গত বছর মারা গেছেন পাকিস্তানের অন্যতম সেরা পর্বতারোহী আলী সাপারা। এছাড়া জন স্নোরি, হুয়ান পাবলো, সার্গেই মিনগোটের মতো পর্বতারোহীরাও মৃত্যুবরণ করেন।

নির্মল পূর্জা সবচেয়ে কম সময়ে ৬ মাসের মধ্যে ১৪ টি ৮,০০০ মিটার পর্বত সামিট করে ‍পুরো পৃথিবীকে তাক লাগিয়ে দেন। তার কাহিনী নিয়ে ”প্রজেক্ট পসিবল” নামে একটি মুভিও নির্মাণ করে নেটফ্লিক্স। কেটুর শীতকালীন সামিটের ইতিহাস রচনা করার পর তিনি তার নিজের এজেন্সী “এলিট এক্সপেড” প্রতিষ্ঠা করেন। এ প্রতিষ্ঠানটির এখন পর্যন্ত পর্বতারোহণের শতভাগ সাফল্য রয়েছে। কেটু ও ব্রড পিক এক্সপিডিশনের জন্য তারা ৬০ হাজার পাউন্ড চার্জ করে যা বাংলাদেশি টাকায় ৬৮ লাখ টাকার মতো।

এদিকে ২২ জুলাই কেটুর ক্যাম্প ৩ তে মৃত্যবরণ করেন আফগানিস্তানের পর্বতারোহী আলী আকবর শাফি। এর আগে নাঙ্গা পর্বত ও ব্রড পিকে আরো দুই পাকিস্তানি পর্বতারোহীর মৃত্যু হয়। গত বছর কেটু পর্বতে শীতকালীন সামিটের প্রচেষ্টায় মৃত্যু বরণ করা আলী সাপারার ছেলে সাজিদ সাপারা এসেছেন এ বছর এসেছেন কেটু সামিটের জন্য। জন স্নোরি ও আলী সাপারার সাথে ছেলে সাজিদও ছিলেন, কিন্তু অক্সিজেন রেগুলেটর কাজ না করায় তিনি ফিরে আসাতে প্রাণে বেঁচে যান।

ফিচার ছবি ওয়াসফিয়া নাজনীনের পেইজ থেকে

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

তিনমাসে একাধিকবার ভারত যাওয়ার কোন নিষেধাজ্ঞা নেই

তিনমাসে একাধিকবার ভারত যাওয়া যাবেনা এই তথ্যে গত বৃহস্পতিবার থেকে সোশ্যাল মিডিয়া সয়লাব হয়ে পড়ে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published.