পড়ন্ত বিকেলে রোজ গার্ডেন প্যালেসে

পরিব্রাজকের পথে নেই কোন স্থিরতা। নেই কোন বেকার দিন। পরিব্রাজকের মনের জানলা অস্থির ভ্রমণের দুয়ার। পথের মাঝেই যেন খুঁজে পায় আপন ঘর। সেই আপন ঘরের খোঁজে হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথ হেঁটে বেড়েয়েছে কত পরিব্রাজক। সোমবার যখন সব কাজ সেরে যখন আকাশ পানে তাকিয়ে খুঁজে জীবনের লেনদেন, আমায় ডাকেনি নাটোরের বনলতা সেন। বরং পকেটে ভাইব্রেশনে টের পেলাম নিরবঘাতি মেজাজে মুঠো ফোন আমায় দিচ্ছে নতুন কোন ভ্রমণের বার্তা। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখলাম ফোন দিয়েছেন পুরান ঢাকার ঈসমাইল হোসেন ভাই।

গেটের সামনে অপেক্ষারত পথিক। ছবি: লেখক

ইসমাইল ভাই চিরাচরিত ভঙ্গিতে বলিলেন আশিক ভাই আইবেননি রোজ গার্ডেন, আমি আর আশরাফ পারভেজ আসছি। আমি এই অফার পাবার পর দুদণ্ড ভাবিনি, কারণ দুদণ্ড শান্তির আভাসের জন্য তো জীবনানন্দ ছুটে গেছে নাটোরের বনলতা সেনের কাছে। কাল ২২ অক্টোবর, জীবনানন্দের মৃত্যু দিবস। আর আজ এই ক্ষণে আমায় ক্রমাগত ভাবায় এই মহান কবিকে নিয়ে। কি বলে গেছেন তিনি:

হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।

বাড়ির সাথে দেখা যায় লেখকে চাঁদ বদনখানি। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

তাই তো জীবনানন্দের মত কল্পনার পাখা মেলে পরিব্রাজকের মত হাওয়ায় হাওয়ায় বিশ্ব ঘুরে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটায়। গরীবের পকেট কুহু কুহু কাদে এই সব অলীক স্বপ্ন দেখলে। তবে রোজ গার্ডেন যেতেই পারি। আর ঢাকা শহরের জ্যাম পারি দেওয়া সিংহল সমুদ্রের সমানই হবে। এত ভূমিকা টানার পর মূল গল্পে আসা যাক। বাসা থেকে বের হলাম রিক্সা নিয়ে, ফুরফুরে বিকালে মৃদুমন্দ হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে রিক্সায়ালা মামা। বহু দিন পর অফিস টাইমে রাস্তা ফাঁকা। পুরান ঢাকায় থাকার এই তো সুবিধা। সব কিছু প্রায় কাছাকাছি জায়গায়। যেন এক নিমিষেই রিক্সায়ালা মামা আমাকে সিন্দাবাদের জাহাজের মত নামিয়ে দিলেন হুমায়ুন সাহেবের বাড়ির সামনে।

প্রচারেই প্রসার। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

ঢাকার মধ্যে যে কয়টি প্রাচীন স্থাপনা আছে তার মধ্যে রোজ গার্ডেনের নাম না বললেই নয়। হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি নামে লোক মুখে সর্বাধিক পরিচিত এই নান্দনিক স্থাপনা। টিকাটুলি কেএম দাশের রোড শেষ মাথায় মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে অনেক ইতিহাসে সাক্ষী এই বাড়িটি। এ বাড়ি ইতিহাসে বির্বতণে কখন হয়েছে রোজ গার্ডেন, কখনও বা হয়েছে হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি, স্বাধীনতার পর এই বাড়ি ইজরা নেয় বেঙ্গল স্টুডিও। এখন বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার ৩৩১ কোটি টাকা বিনিময়ে কিনে নেয় এই বিশাল প্রপার্টি। ঢাকা বিভাগীয় জাদুঘর হিসাবে খুব শ্রীঘই উদ্ধোধন হতে যাচ্ছে এই রোজ গার্ডেন।

নান্দনিক। ছবি: লেখক

দাঁড়িয়ে আছি রোজ গার্ডেনের দরজার সামনে। ঢাকা জাদুঘরের সাইনবোর্ড দেখলাম এর এক পাশে রোজ গার্ডেনের ফলক। হারিয়ে গেলাম অতীতের কোন একদিনে। আর দশটা সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা নব্য ধনী ঋষিকেশ দাসকে পাত্তা দিত না তৎকালীন খানদানি, বনেদি ও নবাব পরিবারগুলো। একদা জমিদার নরেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরীর বাগান বাড়ি বলধা গার্ডেনে কোন এক জলসার রাতে চরম অপমান হয়ে ফিরে আসতে হয়েছিল। তখন থেকেই সিন্দাবাদের ভূত চেপে বসে যে করে হক এই বুর্জোয়াদের সমকক্ষ হতে হবে। এরপর তিনি নিজের প্যালেস তৈরির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন।

খুলবে কে বন্ধ দুয়ার। ছবি: লেখক

দৃঢ় সংকল্পে ১৯৩১ সালে পুরান ঢাকার বর্তমান কেএম দাশ রোডে গড়ে তোলেন তার আলিসান বাগান বাড়ি। বাগানে প্রচুর গোলাপের গাছ থাকায় এর নাম হয়ে যায় রোজ গার্ডেন কিন্তু বিধিবাম। ভবনটি সজ্জিতকরণ কাজ সমাপ্ত হওয়ার আগেই চরম অর্থ সংকটে পড়ে যান ঋষিকেশ দাস।

হ্যাঁ আমিও দাঁড়িয়ে ছিলেম। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

আর্থিক চরম বিপর্যয়ের দিনে কেউ এগিয়ে আসেনি। তাই বাধ্য হয়ে ১৯৩৭ সালে রোজ গার্ডেন প্যালেসটি বিক্রয় করে দেওয়া হয় আব্দুর রশীদের কাছে। প্রাসাদের নাম হয়ে যায় রশীদ মঞ্জিল। সেই রশীদ সাহেবের বড় ছেলেই পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে রোজ গার্ডেনের মালিকানা লাভ করেন। যিনি হুমায়ূন সাহেব নামে সর্ব পরিচিত ছিলেন।

দুটি দেব শিশু। ছবি: লেখক

গেট দিয়ে এবার ভিতরে প্রবেশ করলাম। খাতা কলমে নিজের নাম এন্ট্রি করে যখন বাড়ির সামনে এলাম এক রাশ মুগ্ধতা যেন আমায় গ্রাস করতে চায়। ২২ বিঘা জমির উপর জাকিয়ে বসে আছে এক শ্বেত শুভ্র সফেদ প্যালেস। সেই প্যালেসে প্রতিটা কোনা যেন লুকিয়ে রেখেছে কোন গল্প কথা। হারানো ইতিহাসের সুর বাজে যেন কোথায়। এখানেই তো ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের প্রাথমিক আলোচনা সভা বসেছিল। বলতে গেলে এটাই বর্তমান আওয়ামী লীগের জন্মস্থান।

এ কেমন বাচ্চামি!!

ওই তো দূরে দেখা যাচ্ছে আশু দাদা আর ঈসমাইল ভাইকে। কাছে এসে অলিঙ্গন পর্ব সেরে অদ্ভূত অঙ্গ ভঙ্গিমায় শুরু হলে ছবি তোলার পর্ব। এরই মধ্যে আশরাফ দাদাকে ঘুষি দিয়ে আলু বানিয়ে দেওয়ার নকল ভঙ্গিমা ধরা পড়লো ভিউ ফাইন্ডার ঈসমাইলের মোবাইলে। বাচ্চামিতে যেন আজকে কেউ পিছিয়ে নেই। কে যে গুঞ্জন শুনায় ঐতিহ্য খুড়ে। এথায় সেথায় ছড়িয়ে ছুটে আছে দৃষ্টিনন্দন শ্বেত মার্বেল পাথরের মানব মূর্তি। বয়সের ভারে বিবর্ণ শ্যাওলা জমেছে একেবারে পশ্চিম দিকে এক গ্রীক দেব শিশুর শ্বেত মার্বেলের দেহে। সে জড় তার হৃদয়ে প্রাণের সঞ্চার হলে বলতো হয়তো কত হারানো ইতিহাস। এক হাত উচিয়ে কোপানোর ভঙ্গিতে দাড়িয়ে গ্রীক দেবশিশু। আমরা মূর্তি পিছে উকিঝুকি দিয়ে বাড়িসহ সেলফি নিলাম।

ঐতিহ্য। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

ভবনের সামনে বেশ বড় আঙ্গিনা। সেথায় এসেছে আজ কিছু ছিটেফোটা দর্শনার্থী। আঙ্গিনার মাঝখানে সেই ফাউন্টেন সাক্ষী দেয় গোলাপ গাছগুলোর। একদা এই সাদার মাঝে রক্তিম হয়ে ফুটে থাকতো তারা। এখন শুধু মহীনের ঘোড়াগুলোর জন্য রয়ে গেছে সবুজ ঘাস। সবুজের আঙ্গিনা পারি দিয়ে দেখা যায় পুকুর। শান বাধানো ঘাটের সাথে সিড়িও আছে। শেষ বিকালের বিষণ্ন আকাশে ছায়া পড়ে পুকুরের জলে, জীবনের বিবর্ণ জল তরঙ্গের নতুন রঙ নিয়ে যেন আকাশের সাথে খেলা করে। সিড়ির সামনে লোহার তোরণের মাজেজা জানতে না পারলেও ছবি তুলতে এক বিটকেলে ঝামেলা তৈরি করছিল এই তোরণ।

আহা ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

সব কিছু ছাপিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখি শ্বেত শুভ্র সেই প্যালেস। দোতলা বিশিষ্ট এই প্যালেসের নিচতলায় হল রুম, একটি কোরিথিয়ান কলাম ও আটটি কক্ষ রয়েছে। ছয়টি সুদৃঢ় থামের ভরে দাঁড়িয়ে আছে প্যালেস। দোতলায় নাচ ঘর ছাড়াও রয়েছে, পাঁচটি ভিন্ন কক্ষ। নাচের কথায় মনে পড়ে গেল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে স্বাধীন হবার আগের বছরই রোজ গার্ডেন ইজারা নেয় বেঙ্গল স্টুডিও।  হারানো দিন নামের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের শুটিং এই বাড়িতে হয়েছিল। এ কারণে সে সময় ভবনটি ‘হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এরপর অনেক ঘাটের পানি খেয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার এ ভবনটি ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ দুই হাজার ৯০০ টাকা মূল্যে কিনে নেয়।

নান্দনিক বটে। ছবি: ঈসমাইল হোসেন

দেখতে দেখতে পাঁচটা বেজে গেল। আনসারের বাশির ফুয়ে যেন বিদায়ের ঘণ্টা বেজে উঠলো ঘড়িতে। এবার যে বিদায়ের পালা। বিদায় বেলায় আর একবার আসার ঘন্টি বাজিয়ে গেল। আবার আসা হবে এই প্যালেসে। তখন না হয় জাদুঘরের গল্প শুনাবো। আজকের মত বিদায় পাঠক। তবে বিদায় বেলায় বলে যাই কিভাবে যাবেন রোজ গার্ডেন।

ক্ষ্যাপা কোপা। ছবি: লেখক

যে ভাবে যাবেন:
গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের কাছ থেকে রিক্সায় যেতে পারবেন। রিকশা রিক্সাওয়ালাকে বললেই হবে ‘হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি’ যাবেন। গুলিস্তান থেকে রোজ গার্ডেন প্যালেস বা হুমায়ূন সাহেবের বাড়ির ভাড়া পড়তে পারে ৫০-৬০ টাকা।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

About Ashik Sarwar

Check Also

ট্রেকিং করতে গেলে যে জিনিসগুলো অবশ্যই সঙ্গে নিবেন

শীতের সময় আমাদের দেশে অনেকেই ট্রেকিং করতে বের হয়ে পড়েন। যারা প্রথমবারের মতো বের হচ্ছেন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *