মারায়ন তং চূড়ায় অতৃপ্ত সূর্যোদয়: যেতে যেতে পথে

বাস যখন চলা শুরু করলো তখন ও বৃষ্টির অবিরাম জলধারা ঝরছিলো। আস্তে আস্তেই বাস চলছে আমরা নিজেদের মধ্যে গল্প করছি সাথে সাথে বাসে দাড়ানো যাত্রীও উঠছে। যাত্রাবাড়ি পার হতেই দাড়ানো যাত্রীতে ভরে গেলো বাস। আমরা বুঝলাম লোকাল বাস মানে কিছুটা মেনে নিতেই হবে। আতঙ্কিত হচ্ছিলাম সারা রাস্তা যদি এরকম যাত্রী তুলে আরা নামায় তাহলে চট্টগ্রাম যেতেই দুপুর না হয়ে যায়। একবার সিলেটের লোকাল বাসে উঠে সকাল ৮ টায় পৌঁছেছিলাম। সেটাই বারবার মনে পড়ছিল। কিন্তু আমাদের চিন্তা অমূলক প্রমান করে কাচপুর আসতেই সব দাড়ানো যাত্রী নেমে গেলো। বাসের গেইট লক করে বাস চালানো শুরু করলো। যেহেতু বৃষ্টি হচ্ছিলো তাই আস্তে-ধীরে চলতে লাগলো বাস আমরাও নিশ্চিন্ত মনে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগলাম।    

অবাক হয়ে দেখি মাতামুহুরি। ছবি: লেখক

ঘুম হলো কি হলো বুঝে উঠার আগেই বাস থেমে গেলো এবং সুপারভাইজার এর সেই চিরচেনা ঘোষণা ‘সম্মানিত যাত্রী সাধারণ, আমরা এখন কুমিল্লায় হোটেল বিরতি দিচ্ছি, সময় ২০ মিনিট’ শুনেই ধরফর করে উঠলাম।পাশের সিটে বসা তাহান ভাই তার হেডফোনে গান শুনছে আর পিছনের সিটে বসা রাজন ভাই অঘোরে ঘুমাচ্ছে। তাকে জেগে তুললাম। ঘড়িতে দেখলাম রাত ১ টা বেজে ৩০ মিনিট, তখনো বৃষ্টি হচ্ছে। ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে বৃষ্টি নিয়ে গবেষণা চলতে লাগলো। আমাদের ট্যুর আসলে কিভাবে হবে, বৃষ্টি আপার অবিরাম বর্ষণের মধ্যেই কি ধুয়ে যাবে পূর্নিমার রাত? বিরতি শেষে বাস চলতে লাগলো। আমরা আবারো ঘুমানোর চেষ্টা করছি তবে এবার হয়তো কিছুটা ঘুমিয়েছিলাম। ফেনীতে অনেক যাত্রী নেমে গেলো। বৃষ্টি এদিকে কম মনে হলো। একসময় এসে ঘোষণা শুনলাম চট্টগ্রামের যাত্রী নামার জন্য তৈরি হন। ঘড়িতে দেখলাম সময় ৪:৩০। এর মধ্যে রাজন ভাই আবারো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তাকে টেনে তুলে বাস থেকে নামলাম। নেমে অবাক হলাম এ কেমন লোকাল বাস! যে ভোর না হতেই নামিয়ে দিলো? আমরা এতো তারাতাড়ি আসবো ভাবতে পারিনি। অনাকাঙ্ক্ষিত ভালো সার্ভিস পেয়ে গেলাম সিডিএম ট্র্যাভেলস থেকে। 

চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের জনপ্রিয় মার্শা সার্ভিস। ছবি: মার্ছা ট্রান্সপোর্ট ফেসবুক পেজ

এবার অতৃপ্ত ঘুম নিয়ে ভোররাতে অলংকার মোড়ে দাঁড়িয়ে চোখমুখ কচলাতে কচলাতে আশেপাশে বসে বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা খুঁজতে লাগলাম। পাশেই একটা রেস্টুরেন্ট খোলা পেয়ে সেখানে বসলাম, ব্যাগ রেখে হাত মুখ ধুয়ে ঘুম তাড়ানোর চেষ্টা করলাম। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় আশার বাণী ছিলো এখানে কোনো বৃষ্টি হচ্ছিলোনা। চারদিক দেখে বুঝলাম রাতে বৃষ্টি হয়েছে এখন নেই। গরম পরোটা, ডাল-সবজি, ডিম দিয়ে নাস্তা করলাম। চা চাইতেই বললো একটু দেরী হবে আমাদের তো সময়ের অভাব নেই। প্রায় ১০ মিনিট দেরীতে চা আসলো, চা পান করতে করতে ফজরের আযান হয়ে গেছে। চারদিকে আলো ফুটে উঠেছে। আমরাও রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আলীকদম বা চকোরিয়া যাওয়ার বাসে উঠার জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু কোনো বাসেই উঠতে না পেরে মাহিন্দ্রাতে উঠলাম বহদ্দারহাট যাওয়ার জন্য। জিইসি মোড়ে গিয়ে সে যাত্রী কম দেখে আর যাবেনা অগত্যা আবার মিনিবাসে উঠে বহদ্দারহাট নামলাম।

চট্টগ্রাম থেকে চকোরিয়ার ভ্রমণসঙ্গী মার্শা। ছবি: আল আমিন/বিডি বাস লাভার

বহদ্দার হাটের চান্দগাও নতুন থানার সামনে থেকে কক্সবাজারগামী বাস পাওয়া যায়। এস আলম, সৌদিয়া, মার্ছা গেইট লক চেয়ার কোচ। এছাড়া নিউ হানিফ, ইউনিক পরিবহন, শ্যামলী সার্ভিসসহ অন্যান্য লোকাল সার্ভিস থাকে (অনেকেই অরিজিনাল মনে করে উঠে যায়)। সারারাত লোকাল বাসে এসে শরীর একটু আরাম খুঁজতে চাইলো। তাই মার্ছা বাসে চকোরিয়ার টিকেট নিলাম ১৮০ টাকা করে। এখান থেকে কক্সবাজারের ভাড়া ২৫০ টাকা। মার্ছা একবছরের কিছু বেশি সময় হলো চালু হয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ জনপ্রিয় এই রুটে। প্রতি ১০-১৫ মিনিট অন্তর বাস ছাড়ে, সার্ভিসও খুব ভালো।

আরামদায়ক আসন আর দারুন লেগস্পেস। ছবি: বিডি বাস লাভার

গতবছর পহেলা বৈশাখের দিনে কক্সবাজার থেকে আসার পথে মুড়ি, মোয়া, বাতাসার সাথে শুভেচ্ছা কার্ড পেয়েছিলাম মার্ছা থেকে। সেই থেকে এই রুটে গেলে চেষ্টা করি মার্ছায় উঠতে। বাসে উঠে আগের রাতের তুলনায় বিশাল লেগস্পেস পেয়ে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা হাঁটুর তাহান ভাই খুব খুশি। এবার আরামে ঘুমাতে ঘুমাতে চকোরিয়া রওনা দিলাম। সকালের স্নিগ্ধতা গায়ে মেখে, সূর্যের প্রথম আলোয় মুখ ডুবিয়ে বাস চলা শুরু করলো সাই-সাই করে। আগের রাতে বৃষ্টি হওয়াতে প্রকৃতিতে একটা শীতলতার ছোয়া, অল্প খোলা জানালায় প্রবেশ করা বাতাস টাও শরীরে শীতের অনুভূতি দেয়।    

ধাক্কা দিয়ে ঘুমন্ত ইঞ্জিনকে জাগিয়ে তোলা হচ্ছে। ছবি: লেখক

সকালের মিষ্টি রোদে ঘুম ঘুম ভাব নিয়েই ৯ টার একটু আগেই পৌঁছে গেলাম চকোরিয়া। সুপারভাইজারকে বলে রেখেছিলাম আলীকদম যাবো তাই বাজারের শেষে জিপ স্ট্যান্ডে এসেই নামিয়ে দিলেন। চকোরিয়া থেকে আলীকদম প্রতি ৩০ মিনিট অন্তর জিপ ছেড়ে যায়। রাস্তার পাশেই কাউন্টার, টিকেট নিলাম প্রতিজন ৭০ টাকা করে। এখানকার জিপ একটু অন্যরকম, আমরা সাধারণত পাহাড়ে যে জিপ বা চান্দের গাড়ি দেখি উপরে বা পাশে খোলা থাকে, দাড়িয়ে ডানা ছড়িয়ে মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে যেতে পারি কিন্তু এই জিপের চারপাশ খুব আঁটোসাঁটো করে আটকানো।

আমি বন্দী জিপের মাঝে। ছবি: লেখক

পিছনের দিকে গেইট আছে যেটা দিয়ে প্রবেশ করার পর আঁটকে দেওয়া হয়। সকাল ৯ টায় জিপ ছাড়বে, সময় বেশি নেই। আমরা ব্যাগ গাড়িতে রেখে নিচেই দাঁড়িয়েছে, এরমধ্যেই জিপ চালু করার চেষ্টা করছেন পাইলট সাহেব কিন্তু চালু হচ্ছেনা। তারপর যা দেখলাম মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না, অন্যান্য জীপের হেল্পার, ড্রাইভার মিলে ৭-৮ জন এসে জীপকে ধাক্কা দেওয়া শুরু করলো। ধাক্কা দিয়ে কয়েক ফুট সামনে নেয় আবার পিছনে আনে, কয়েকবার এরকম করার পরেই গর্জে উঠলো ইঞ্জিন। আমরা ভাবতেছিলাম যদি পাহাড়ে উঠে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায় তখন কি হবে? আমরা মানসিক ভাবে মাঝপথে জীপ ধাক্কানোর প্রস্তুতি নিয়েই গাড়িতে উঠলাম।  

অনাকাঙ্ক্ষিত যাত্রাবিরতিতে চায়ের কাপে চুমুক। ছবি: লেখক

গাড়ি চলা শুরু করলো ভিতরে খুব চাপাচাপি অবস্থা তার উপর আমাদের সাথে বড় বড় ব্যাগপ্যাক। জিপে বেশিরভাগ স্থানীয় লোকজন উঠেছে। চট্টগ্রাম থেকে একজন লাইনঝিরি যাবে বিয়ের অনুষ্ঠানে আমাদেরকে তার সাথে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন, আমি রাজী হলেও বাকীরা রাজী হলোনা। জিপ কক্সবাজার সড়কে কিছুক্ষণ যাওয়ার পর হাতের বামে আলীকদম সড়কে উঠে গেলো। খুব সুন্দর রাস্তা, দুইপাশে পাহাড়ি সবুজ প্রকৃতি। কিন্তু খুবই আফসোস লাগছিলো আমরা এই সৌন্দর্য সহজেই দেখতে পারছিলাম না। জীপ অনেক উপরের দিকে উঠছিলো, এই রাস্তাটা অনেক উঁচু, চকোরিয়া থেকে শুরু হয়ে এই রাস্তা মিলেছে থানচি গিয়ে।

জায়গার নাম লাইনঝিরি, এখানেই পুলিশ চেকপোস্ট। ছবি: লেখক

বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু রাস্তা বলা হয় এটাকেই যদিও আমরা সবচেয়ে উঁচু অংশ পর্যন্ত যাইনি। লাইনঝিরি এসে কিছু যাত্রী নামানোর পরে জীপ আবার চলতে শুরু করা মাত্রি পুলিশ এসে গাড়ি থামিয়ে চাবি নিয়ে গেলো। ঘটনা জানতে পারলাম অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই ছিলো অপরাধ। জিপের ছাদে এবং পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলো ৫-৬ জন যাত্রী। মাঝপথে হঠাৎ বিরতি পেয়ে নেমে আসলাম জিপ থেকে, জায়গাটায় কয়েকটা দোকান আছে আমরা চায়ের অর্ডার দিলাম।

(চলবে…)                      

এই গুল্পের প্রথম পর্ব পড়ুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/all-divisions/dhaka-division/mayatogh-1/

ভ্রমণগুরুতে পোস্ট করা আমার সব লেখা পড়ুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/author/jewel/

About Jewel Rana

Check Also

রিজলাইনের স্বপ্নপূরণ

প্রথমবার যেবার পেনাডংপাড়া পার হয়ে দুই নড়বড়ে টুলের পথিক ছাউনী টাতে পৌছেছিলাম সেবারই মেঘহীন নীল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *