Breaking News

ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: শৈলকুপার পথে

কাদের নেওয়াজের বাড়ি থেকে বের হওয়া মাত্র ভ্যানয়ালা মামা বললেন, ‘মামা এখানে আর একটা পুরানো জমিদার বাড়ি আছে৷ দেখবেন নাকি।’ আমরা ভাবলাম কতদূর আর হবে এই অজ্ঞাতনামা জমিদার বাড়ি। ভ্যানয়ালা মামা নিজেও সে বাড়ির নাম ভাল ভাবে জানে না৷ তবুও একটা রিস্ক নেওয়া যায়। অফ রুট কিছু তো এভাবেই বের হয়ে আসে৷ তবে রিস্কটা যে এভাবে কাজে লেগে যাবে কে জানতো৷

চলছে ভ্যান নতুন পথে৷ এ পথ আরও সবুজ, এ পথ আরও সুন্দর৷ নতুন এ পথ যেন শুনাচ্ছে শতবর্ষী বৃক্ষের কথা৷ এ পথেই কি একদা খান জাহান আলীর পদচিহ্ন পড়েছিল৷ আমি আবার ফিরে গেলাম যশোর রোডের সেই রোমাঞ্চে৷ যশোর ঘেষা জেলাগুলোতে যে এভাবে মহীরুহ তাদের লুকিয়ে রেখেছে না আসলে তো জানতেই পারতাম না৷

শৈলকুপার পথে। ছবি: লেখক

পিচ ঢালা পথের দু পাশে বৃক্ষ৷ এত বৃক্ষের সমরোহ দেখে বোধ হয় আকাশটা আজ রাগ করেছে৷ দিনের এ সময় ছায়াদানি বৃক্ষ তার তরুলতায় আমাদের এভাবে জড়িয়ে রেখেছে মনে হয় আমরা তারই হারিয়ে যাওয়া মানব সন্তান৷ পিচ ঢালা এই পথের দুপাশে বৃক্ষ মাঝ দুই চলে যাচ্ছে আমাদের ত্রিচক্রযান৷ বৃক্ষগুলোর যেন পথিক কে ছুতে বড় ইচ্ছা করে তাই তো মাঝে মাঝে তার ডালপালা নুইয়ে পড়ে আমাদের স্পর্শ করতে চায়।

আঁকাবাকা এই পিচ ঢালা পথের শেষটা কোথায়৷ ছায়া সুনিবিড় পাখিদের কলতানে সুশৃঙ্খল বৃক্ষরাজির পূর্ণ সবুজের সমাহারে মনে গেয়ে উঠে কোন বাউল গান৷ বাউলের মতই যাযাবর হব আমি৷ নাম না জানা কত ফলজ, বনজ ও ঔষধী বৃক্ষের সারি৷ যেন কেন শিল্পে তার ক্যানভাসে একেছে কোন ভুবন ভুলানো ছবি, অদৃশ্য সেই সুতোর টানে বেদনার বেনোজলের মত ভেসে যাচ্ছি। নয়াভিরাম এই সবুজের মাঝে একটা বড় রোড সাইন নজর কাড়লো বেশ৷ ঝিনাইদহ জেলায় আপনাকে স্বাগত৷ আমার গ্রাম, আমার ইউনিয়ন, আমাদের থানা শৈলকুপা৷

সেই অজ্ঞাতনামা বাড়ি। ছবি: লেখক

ছিলাম কোথায় এলাম কোথায়৷ এখন আমরা ঝিনাইদহ জেলায় আছি৷ শৈলাকুপা ঝিনাইদহের একটি উপজেলা৷ সে আবার মাগুরার শ্রীপুরের গা ঘেষা৷ ডাবল ডিম ওয়াফির সাথে ফিলোসফিক্যাল কথায় ব্যস্ত ছিলাম। সামনে পাটের খড়ি আর গাছের মাঝ দিয়ে উকি দিচ্ছে একটি নদী। কি অপরূপ সুন্দর তার রূপ। ভ্যানয়ালা মামাকে থামাতে বললাম। এরপর জিজ্ঞেস করলাম এইটা কি নদী৷ তার উত্তর যেন তৈরি ছিল বললো কুমার নদী৷

আহা কুমার নদী পল্লী কবির বাড়ি আম্বিকারপুর থেকেই কি চলে এল শৈলকুপা৷ তবে আম্বিকাপুরে তুমি যে ছিলে হাঁটু সমান পানি নিয়ে৷ শৈলকুপা এসে কত সুন্দর টলটল করে বয়ে যাচ্ছো। কথিত আছে এই কুমার নদীতে একদা প্রচুর শৈল মাছ পাওয়া যেত। সেই থেকে এই উপজেলার নাম হয়ে গেছে শৈলকুপা। তবে এখন আর মাছ পাওয়া যায় না আমার গাইড কাম ভ্যানয়ালা মামা বললো৷ নদী দূষণের কড়াল গ্রাসে কুমার নদীর শুধু ছিটেফোঁটা সৌন্দর্য বাকি আছে। তাও তো নদীর ধারে আসলে মানুষের কেমন মন ভাল হয়ে যায়৷

শৈলকুপার পথে ঘাটে। ছবি: লেখক

বিরতি শেষে ভ্যান আবার চলা শুরু করলো৷ যশোরে যাওয়া পড়েছে অভয়নগর। ঠিক দুই মাসের ব্যবধানে যাব আবার অন্য এক অভয়ে। এর নাম অভয়পুর৷ ভ্যান ঠিক অভয়পুর গ্রামের ওই পুরান জমিদার বাড়ির সামনেই দাঁড়ালো। আগের রাতে বোধ হয় বৃষ্টি হয়েছিল। তাই কাঁদায় স্তূপ জমেছে চারপাশে৷ তার মাঝেই শৈল্পিক ভাবে কাটিয়ে বাড়ির কাছে আমরা এসে পড়লাম৷

বাড়ির দু’তলায় গৃহকর্তীকে দেখা যাচ্ছে৷ অনুমতি ছাড়া তার বাড়ির ছবি আর কিভাবে তুলি৷ অনুমতি সে দিল এবং জিজ্ঞেস করলো আমরা কোথায় থেকে এসেছি৷ পরিচয় পর্ব শেষে এই জমিদার বাড়ি নিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম। বিশেষ কোন তথ্য দিতে পারলো না। কারণ তারা এ বাড়িতে ভাড়া থাকে। আসল মালিক কোথায় সেও তারা জানা নাই৷

কুমার নদী ব্যানার সামনেই দেখা যাচ্ছে ব্রীজ। ছবি: লেখক

বিশেষ আর্কষণ করার মত সে রকম আহামরি বাড়িও নয়। তাই আমরা সময় নষ্ট না করে ভ্যানের চাকা ঘুরাতে বললাম শ্রীপুর শহরের দিকে৷ ফিরে যাচ্ছি আবার সেই শ্রীপুর শহরে। শ্রীপুর নামে বাংলাদেশের আর একটি উপজেলা আছে গাজীপুরে। তাই দুই শ্রীপুরে গণ্ডগোল লাগার সম্ভবনা একেবারে বাদ দেওয়া যায়। যাকগে সকাল থেকে প্রবাহমান ঘটনা গুলো যেন ক্রমাগত চোখের সামনে ভেসে উঠছে। ঘড়ির কাটায় বারটাও বাজেনি।

আমাদের এখান থেকে যেতে হবে নড়াইল। এসএম সুলতান মেলা, নৌকা বাইচের আর্কষণেই তো ঢাকা থেকে এত দূরে আসা। সে আশা কতটুকু মিটে সে না হয় সময় বলে দিবে। ভ্যান রাজপথে সো সো বেগে ছুটছে। মিনিট বিশেক পর আবার সেই ব্রিজের ধারে নামিয়ে দিল যেখানে আমরা বাস থেকে নেমেছি। হাতে অফুরন্ত সময়। তো হয়ে যাক মালাই মারা কারাক চা। সে চায়ের সন্ধানে আশে পাশে উকিঝুকি দিচ্ছি।

পার্ক থেকে তোলা কুমার নদী। ছবি: লেখক

ব্রিজের পাশেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফলক দেখতে পেলাম আর তার পাশে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও ছোট একটি পার্ক। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়নে পার্কটি গড়ে উঠেছে। যেই কুমার নদী শৈলকুপায় দেখে এসেছি সেই কুমার নদী এখানে দেখা যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফলকে সুন্দর ভাবে লেখা আছে কুমার নদীর নাম। মাতালি ঝিরিঝিরি হাওয়া বইছে, বৃষ্টি আসি আসি করছে। আমরা পার্কে বসে খানিকক্ষণ গল্প-গুজব করলাম। এর সাথে কুমার নদীর রুপ আবার ফিরে ফিরে দেখতে লাগলাম। পার্কের পাশেই মালাই চায়ের দোকান ছিল। চা পর্ব শেষে এবার বাসে উঠে বসলাম। ফিরে যাব আবার মাগুরা।

About Ashik Sarwar

Check Also

ভ্রমণে সাথে থাকুক সেরা পাওয়ার ব্যাংক

একটা সময় ছিল যখন ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা ব্যাগে কিছু কাপড় ঢুকিয়েই ভ্রমণে বের হয়ে যেতো। প্রযুক্তিগত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *