মালদ্বীপে বাংলাদেশি রিকির অন্যরকম জীবন

ছেলেটার নাম রিকি, বাড়ি বাংলাদেশের কেরানীগঞ্জে! মালদ্বীপের সবচেয়ে জনপ্রিয় পাবলিক আইল্যান্ড মাফুসিতে তার একটা নান্দনিক ডাবের দোকান আছে। আর দোকান বলতে আমাদের চোখের সামনে যা ভেসে উঠে জিনিসটা তা নয়, এটা মাফুসির বিকিনি বীচের পাশে দাঁড়ানো চমৎকার একটা হ্যান্ড পেইন্টেড মাইক্রো বাস, যার পেটের ভেতর মালদ্বীপের দারুন সুমিষ্ট ডাবের খনি! তার দোকান বললেও ভুল হবে, আসলে দোকান এক মালদিভিয়ানের, সে শুধু দোকানটায় মালিকের জন্য কাজ করে। ব্যাস, পরিচয় বলতে এটুকুই। আজ থেকে এগার বছর আগে ২০১১ সালের এপ্রিলের ১৫ তারিখ মাত্র ১৬ বছর বয়সে সে তার এক বন্ধুকে নিয়ে চলে আসে মালদ্বীপ। তখন সে নিজের নামটাও ঠিকমত লিখতে পারতো না। রিকিকে নিয়ে করা এমনই ছোট্ট একটা লেখা ভ্রমনগুরুতে পোস্ট করার পর সেটি প্রচুর মানুষের নজরে আসে, এর অবশ্য আরো বিশেষ একটা কারণ রয়েছে। ২০১১ সালের ছোট্ট রিকি এখন বিবাহিত। সে শেষ থার্টিফার্স্ট নাইটে বিয়ে করেছে এক রাশিয়ান পাইলটকে! সেটা নিয়েই ছিল সবার তুমুল আগ্রহ।

মালদ্বীপে ডাবের ভ্যানের সাথে রিকি

ডাব বিক্রেতাকে কেন একজন পাইলট বিয়ে করবে, অথবা পাইলট কেন আমাকে খুঁজে পেলোনা টাইপের কিছু হাহাকার তৈরি হয়েছে পোস্টের কমেন্ট বক্সে। সেই পোস্টের পর অনেকেই মালদ্বীপে গিয়ে ডাব বিক্রি করাটাই জীবনের প্রধান ব্রত বানিয়ে ফেলেছেন। রিকির মতোই একটা জীবন তাদের চাই, সারাদিন ডাব বেঁচে সারারাত বিমানে পাইলট নিয়ে ঘুরবে! আবার অনেকেই তাদের দুজনকে একসাথে দেখতেও চেয়েছেন। তাদের জন্যই আজকে আমাদের রিকি আর তার রাশিয়ান পাইলট স্ত্রী নাটালিকে নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত জানানোর চেষ্টা। রিকি মালদ্বীপে আসার পর মালদ্বীপে বসবাসকারী অন্যান্য অনেক অবৈধ বাংলাদেশিদের মতোই এখানে থাকতে শুরু করে। এখানে বলে রাখা ভালো মালদ্বীপের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে সেদেশের পর্যটন, আর এই পর্যটনের সিংহভাগই পরিচালিত হচ্ছে হাজার হাজার বৈধ ও অবৈধভাবে বাস করা বাঙালিদের হাতেই। রিকিও তাদের মধ্যে একজন হয়ে গেলো। তার প্রথম কাজ ছিল লোকাল একটা দ্বীপের মধ্যে নানা জায়গায় ফুড ডেলিভারি করা।২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সে এই ডেলিভারির কাজই করে। এবং সেটা করে যে কটা আয় হতো সেটা দিয়েই তার দিন বেশ কেটে যেত।

নাটালীর সাথে রিকি

এরমধ্যে মালদ্বীপের আরেকটা লোকাল আইল্যান্ড ‘মাফুসি’ জমজমাট হতে শুরু করে টুরিস্টদের কাছে। সে চলে আসে মাফুসি আইল্যান্ডে। এখানে সে এসে জুসবারে কাজ শুরু করে। প্রতিদিনই তার জুসবারে কত শত পর্যটক আসে যায়, সে তখনও ইংরেজি বলতে পারে না, কথা বলা, আনন্দ ফুর্তি সবই তার বাঙালি বন্ধুদের সাথে, বাংলাতেই। এদের মধ্যে তার বন্ধু রিয়াদ তাকে সবকিছুতেই একটু বেশিই সাহায্য করে। দিন তো আগে থেকেই ভালো যাচ্ছিল, বাংলাদেশের জীবন থেকে ভালো। এর মধ্যে ২০১৭ সালের নভেম্বরে রাশিয়া থেকে মা আর বান্ধবী নিয়ে বেড়াতে আসে সুদর্শন এক রাশিয়ান তরুণী নাটালী (Nataly)! রাশিয়ায় একটা বিমান সংস্থায় পাইলট হিসেবে কাজ করা নাটালির তিন সপ্তাহের মালদ্বীপ ভ্রমণের মধ্যে দুটো সপ্তাহ কেটে যায়। শেষ সপ্তাহে তার নিয়তি তাকে নিয়ে যায় রিকির জুসবারে। পরপর তিনদিন নাটালি আর তার মা বান্ধবী রিকির জুসবার থেকে জুস খায়, সেই তাদের প্রথম দেখা। নাটালি আর তার মায়ের সাথে রিকির অনেক কথা হয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো তখন রিকির কথা নাটালি বুঝতে পারে না, নাটালির কথা রিকি বুঝতে পারে না। কিন্তু তারা বুঝতে পারে তারা একজন আরেকজনকে যা বলছে সেটা তাদের পছন্দের কিছু। সেই থেকে নাটালির মা’ও রিকিকে পছন্দ করতে শুরু করে। সে খেয়েছে কিনা, কোথায় কি করছে তা খোঁজ নেয়ার পর্ব শুরু হয়। রিকির বন্ধু রিয়াদ মাঝে মধ্যে তাদের দোভাষী হয়ে কাজ করে। সেদিন নাটালির বিদায় ঘণ্টা বেজেছে, কাল ওদের ফ্লাইট। সকাল সাতটায় দ্বীপ ছেড়ে চলে যাবে নাটালি, রিকির মন খারাপ। সকালে ওর ডিউটি, ঘুমিয়ে পড়লে সকালে নাটালিকে বিদায় জানাতে পারবে না, তাই সারারাত নাটালির সাথে সাগরপারে বসে থাকলো সে। এর মধ্যে বিনিময় হয় দুজনের হুয়াটসএপ নাম্বার। সারারাত দুজনের ভাষাহীনতাও কত কিছু বুঝিয়ে দিলো দুজনকে কে জানে! নাটালি চলে যায়।

মালদ্বীপের নয়ানাভিরাম দ্বীপ মাফুসি

রিকির সাথে এরপর নিয়মিতই কথা হয় নাটালির, এর বেশিরভাগই সে বুঝতে পারে না। ওর বন্ধু রিয়াদ যেটুকু বুঝিয়ে দেয় সেটুকুই বুঝতে পারে। কিন্তু কোন কিছু না বুঝেও সে বুঝতে পারে নাটালিও তাকে তার মতোই মিস করে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে মাত্র দু মাস পর আবার নাটালি মালদ্বীপ চলে আসে একমাসের জন্য। এই সময় থেকে নাটালিই তাকে টুকটাক ইংলিশ শেখানোর দায়িত্ব তার কাঁধে তুলে নেয়। একটা মাস দারুন কিছু সময় কাটিয়ে নাটালি আবার চলে যায় রাশিয়া। ২০১৯-২০২১, এই তিন বছর তাদের ভিডিও কল ছাড়া আর কখনো দেখা হয়নি, এই তিন বছরে রিকি আরো কনফিডেন্ট। সে এখন ডাবের কারবারি। জুসবার থেকে ডাবের ব্যাবসায় সে আরো ভালো থাকতে শুরু করে। নাটালি প্রতিদিন ডিউটি শেষ করে তার খোঁজখবর নেয়। এর আগেও রিকির বাংলাদেশে একটা গার্লফ্রেন্ড ছিল! কিন্তু কিছুক্ষণ ফোন অফলাইন থেকে অনলাইনে থাকার পর সেই মেয়েকে নক না দিলেই ‘কই ছিলা?’ ‘কার সাথে কথা বলতেছো’ ‘খোঁজ নাওনা কেন?’ ‘কার সাথে ছিলা?’ টাইপ নানা প্রশ্ন করে দিন খারাপ করে ফেলতো। যে কারণে শেষে সেই সম্পর্কটা আর টিকে না। কিন্তু নাটালি তাকে দিয়েছে দারুন একটা কমফোর্ট, সারাদিন একটা ফোন, সারাদিনের জমানো সব কথা, ব্যাস! সারাদিন ব্যাবসায় মন, রাতে প্রেমিকার ফোন! জীবন তো এটাই! দারুন সময় কাটছে রিকির, এর মধ্যে তারা সিদ্ধান্ত নেয় একে অপরকে বিয়ে করার। কিন্তু সমস্যা এক জায়গায়, নাটালি খ্রিস্টান, রিকি মুসলিম। মরে গেলেও রিকি ধর্ম চেঞ্জ করবে না। ২০২১ সালের ডিসেম্বরের ৭ তারিখ নাটালি আসলো, মালদ্বীপে কিছুদিন ঘুরে ফিরে তারা চলে গেলো শ্রীলংকা।

মাফুসি আইল্যান্ডের সমুদ্র সৈকত

জিজ্ঞেস করলাম শ্রীলংকা কেন? রিকি জানায় যেহেতু সে মালদ্বীপের নাগরিক না এবং ছেলে মুসলমান আর মেয়ে খ্রিস্টান, তাই মালদ্বীপে বসে তাদের বিয়ে করা ছিল অসম্ভব। তাই বিয়ে করতে তারা চলে যায় পাশের দেশ শ্রীলংকা। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো শ্রীলংকায় বিয়ের আগে নাটালি আর তার মা কে কলেমা পড়িয়ে ও বুঝিয়ে মুসলমান বানায় রিকি। তারপর শ্রীলংকার কোর্টে গিয়ে অনাড়ম্বর একটা অনুষ্ঠান করে থার্টিফার্স্ট নাইটে তারা একে অপরকে বিয়ে করে। আর ‘নাটালি’ নামটা বাদ দিয়ে রিকি তার রাশিয়ান বউয়ের নাম রাখে ‘নাতাশা’! মাত্র পাঁচ মাস হলো রিকি নাটালিকে বিয়ে করেছে। আমার সাথে রিকির দেখা হয় মে মাসের মাঝামাঝি। তখন শুধুমাত্র তার জীবনের সারমর্ম শুনে সেটা ভ্রমনগুরুতে পোস্ট করা হয়। সেই গল্পের ভেতরের গল্প নিয়ে দেশে এসে আবারও ম্যাসেঞ্জারে বিস্তারিত কথা হয় রিকির সাথে। রিকির গল্পটা আসলে কোন গল্প নয়, এটা দেশের বাইরে দারুন শান্তিতে থাকা একটা ছেলের খুবই সাধারণ একটা দিনযাপনের গল্প, যেটা আমাদের কাছে শুনলে অসাধারণ মনে হয়। যেকোন অনলাইন সাংবাদিক তাকে হাতের কাছে পেলে ‘বাংলাদেশি ছেলের প্রেমের টানে কেরানীগঞ্জে আসলো রাশিয়ান পাইলট’ শিরোনাম দিয়ে ক্লিকবেইট রিপোর্ট ফেঁদে ফেলতো হয়তো, অনেক চ্যানেল তার ইন্টারভিউ নিতে শিডিউল খুঁজতো। কিন্তু আমরা যেভাবে দেখি আর চিন্তা করি এর বাইরেও একটা দুনিয়া আছে, যেখানে ভালোবাসা আর মনুষ্যত্বের দাম সবচেয়ে বেশি। উন্নত বিশ্বগুলোতে টুরিস্ট স্পটে কাজ করা অনেক মানুষ বিয়ে করে অন্য দেশের মানুষকে। আমি থাইল্যান্ডে যখন গিয়েছিলাম তখন আমাদের স্নোরকেলিং এর বোটের যে চালক ছিল সে লোকাল হলেও তার বউ ছিল তিনটা। একটা ব্রাজিলিয়ান, একটা ইউকের আর একজন স্পেনের। এরা সবাই সবার জায়গায় সুখী। তাদের দেশে ভালোবাসার টানে কে কোথায় গেলো সেটা নিয়ে নিউজ করার মত সাংবাদিক নেই, কারণ এটা খুবই সাধারণ বিষয় সেখানে। রিকিও সেরকম একজন। রিকির সবচেয়ে ভালো ব্যাপারটা হলো ১৬ বছর বয়সী রিকির চেয়ে ২৭ বছর বয়সী রিকি এখন অনেক ভালো আছে, দারুন একটা জীবন পেয়েছে সে। কারণ সে যে কাজই করুক সেটাকে কখনো ছোট করে দেখতে শিখেনি গত এগার বছরে। সে পেয়েছে একটা দারুন বেড়ে উঠার পরিবেশ। সেই ছোট্ট রিকি আজ সবার সাথে ইংরেজিতে কথা বলে। ইংরেজদের কথা বুঝতে পারে। নাতাশার সাথে অনর্গল কথা বলে সে। তার ইচ্ছা সে নাতাশাকে নিয়ে একবার বাংলাদেশে আসবে, পরিবারের সাথে দেখা করবে! তারপর আবার চলে যাবে সুন্দর আরেকটা পৃথিবীর খোঁজে!

ফিচার ছবি সহ সব ছবি লেখক কর্তৃক সংগৃহীত । এ ওয়েবসাইট প্রকাশিত সমস্ত গল্প ও ছবির কপিরাইট ভ্রমণগুরু কর্তৃক সংরক্ষিত। সম্পাদকের পূর্বানুমতি ব্যতীত কোন সাইট/ফেইসবুকে বা অন্য কোথায় প্রকাশ করা যাবেনা।

About Zonayed Azim Chowdhury

Check Also

বাংলাদেশকে অন এরাইভাল ভিসা দিবেনা ইন্দোনেশিয়া

বাংলাদেশে থেকে পর্যটক টানতে ২০১৬ সালের মার্চ মাস থেকে ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশি নাগরিকদের নামেমাত্র শর্তে ভিসা …

2 comments

  1. দারুন হলো জুনায়েদ। রিকি র জন্য শুভকামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.