প্রথমবার বাই রোডে ভারত ভ্রমণ: জেনে নিন প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য

প্রতিবছর ২০ লক্ষেরও বেশি পর্যটক বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী ভারতে বেড়াতে যান। এর উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই বাই রোডে (স্থল বন্দর দিয়ে) ভারতে যান। আমাদের দেশের অনেকেরই প্রথম বিদেশ ভ্রমণ হয়ে থাকে স্থলপথে ভারতের যাওয়ার মাধ্যমে। যারা প্রথমবারের মতো সড়কপথে ভারত যাচ্ছেন তারা জেনে নিন সীমান্ত পার হতে হলে কি কি কাগজপত্র সংগে থাকতে হয় এবং কি কি করতে হয়।

১. পাসপোর্ট ও ভিসা: সড়কপথে দেশের বাইরে যাওয়ার পূর্ব শর্ত আপনার পাসপোর্ট ও ভিসা থাকতে হবে। যে স্থলবন্দর ব্যবহার করে ভারতে যাবেন আপনার ভিসায় সে বন্দরের নাম উল্লেখ থাকতে হবে। বর্তমানে যে পোর্ট দিয়েই ভিসা থাকুকনা কেন,  ডিফল্ট পোর্ট হিসেবে হরিদাশপুর (বাংলাদেশ অংশে বেনাপোল) ও আগরতলা (বাংলাদেশ অংশে আখাউড়া) দিয়ে যেতে পারবেন। এর বাইরে কোন পোর্ট দিয়ে যেতে হলে আপনার ভিসায় সেই পোর্টের নাম উল্লেখ থাকতে হবে। না হলে কোনভাবেই আপনি সীমান্ত পার হতে পারবেন না।

ভিসায় উল্লেখ থাকা লাগবে পোর্টের নাম। ছবি রাকিব হোসাইন

২. ডলার এনডোর্সমেন্ট: আপনার পাসপোর্টে অবশ্যই ডলার এনডোর্স করা থাকতে হবে। অন্তত ১০০ ডলার এনডোর্স করা থাকলেও হবে। ভারতের ভিসা আবেদন করার সময় যদি আপনি ডলার এনডোর্স করে আবেদন করেন, তাহলে নতুন করে আর ডলার এনডোর্স করতে হবেনা। পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রীর ক্ষেত্রে একজনের পাসপোর্টে জনপ্রতি ১০০ ডলার করে এনডোর্স করা থাকলে বাকিদের ডলার এনডোর্স না থাকলেও চলবে। যেমন পিতার পাসপোর্টে যদি ৪০০ ডলার এনডোর্স করা থাকে তবে মাতা, ও দুই-সন্তানের আলাদা এনডোর্স না থাকলেও হবে।

আর যদি আপনি ব্যাংক স্টেটমেন্ট দিয়ে ভিসা পেয়ে থাকেন, তবে যাওয়ার আগে যে কোন মানি এক্সচেঞ্জ থেকে ডলার এনডোর্স করে নিলেই হবে। অনেকেরই এখন ক্রেডিট কার্ড এনডোর্স করা থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এনডোর্সের মেয়াদ থাকলে আলাদা করে ডলার এনডোর্সমেন্টের প্রয়োজন নেই।

৩. বাংলাদেশী টাকা বা ভারতীয় রুপি: বর্তমান আইন অনুযায়ী জনপ্রতি সর্বোচ্চ ১০,০০০ বাংলাদেশি টাকা নিয়ে সীমান্ত পার হওয়া যায়। অপরদিকে ভারতীয় রুপি পরিবহন আইনত নিষিদ্ধ। প্রাথমিক খরচ মেটানোর জন্য ৫০০ রুপির কম আপনি বহন করতে পারেন, যেটা “অফ দ্যা রেকর্ড” বহন করতে পারবেন। সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হচ্ছে টাকা নিয়ে যেয়ে সীমান্ত পার হয়েই টাকা রুপিতে রূপান্তর করে নিবেন। মনে রাখবেন বর্ডারেই টাকার বিনিময়ে রুপির সবচেয়ে ভালো রেইট পাওয়া যায়। রুপি বহন করলে, সেটা সীমান্ত পার হবার সময় পাওয়া গেলে চাইলে কর্তৃপক্ষ সেগুলো বাজেয়াপ্ত করতে পারে।

৪. নো অবজেকশন সার্টিফিকেট: সীমান্ত পার হবার সময় অবশ্যই আপনার অফিস থেকে দেয়া নো অবজেকশন সার্টিফিকেট দেখানো লাগবে। সাধারণ সব অফিসের হিউমেন রিসোর্স ডিপার্টমেন্টকে মেইল করলেই তারা এ সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়। এ সার্টিফিকেটে পর্যটকের নাম, অফিসের ডেজিগনেশন, পাসপোর্ট নাম্বার ও ছুটির তথ্য দেয়া থাকে। সবশেষে লেখা থাকে এ ভ্রমণে অফিসের কোন আপত্তি নেই। সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে আপনি যখন ভিসার জন্য আবেদন করবেন, সে সময় এনওসিটা এভাবে লিখে নিবেন। মূল কপি জমা দিয়ে দিলেও ফটোকপি সংগে রাখলেই হবে।

৫. ট্রাভেল ট্যাক্স ও টার্মিনাল ট্যাক্স: আকাশপথে ভ্রমণ করলে বিমান টিকেটের সাথেই ভ্রমণ কর দেয়া থাকে। সড়কপথের বিষয়টা সে রকম না। নিয়ম অনুযায়ী সড়কপথে ভ্রমণের জন্য প্রত্যেক যাত্রীকে ৫০০ টাকা ট্রাভেল ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। প্রত্যেকটি জেলার সোনালী ব্যাংকে এ কর জমা দেয়া যায়। এছাড়া সীমান্তেও জমা দেবার সুযোগ থাকে, তবে তাতে বেশি সময় লাগতে পারে। ট্রাভেল ট্যাক্সের পাশাপাশি কয়েকটি পোর্টে অতিরিক্ত টার্মিনাল ট্যাক্সও লাগে (৪০ টাকা ৭৫ পয়সা), সেটাও সীমান্তে দেবার সুযোগ থাকে। বর্তমানে কয়েকটি পোর্টের জন্য অনলাইনেও ট্রাভেল ট্যাক্স দেয়া যায় (বিস্তারিত)

৬. বাংলাদেশের  ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস: প্রতিটি স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন ফরম পূরণ করে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আপনাকে ইমিগ্রেশন শেষ করতে হবে। ইমিগ্রেশনে এসে তাই আপনার প্রথম কাজ হবে এই ফরম খুঁজে নিয়ে পূরণ করে তারপর লাইনে দাঁড়াবেন। লাইনে দাঁড়ানোর আগেই ভ্রমণ করের ঝামেলা শেষ করে আসবেন। ইমিগ্রেশন পুলিশের কর্মকর্তা ভারতে কেন যাচ্ছেন, সংগে কে আছে এধরণের কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন করতে পারে। তারপর আপনার পাসপোর্টে ডিপারচার সিল দিয়ে পাসপোর্ট ফেরত দিবে। পাসপোর্ট ফেরত নেবার পর ডিপারচার সিল সঠিকভাবে দিয়েছে কিনা সেটা দেখে তারপর কাস্টমসে যাবেন।

বাংলাদেশ ইমিগ্রেশনে ডিপারচার কার্ড ছবি লেখক

সাধারণ যাওয়ার সময় কাস্টমস একেবারেই সময় নেয়না। তারা আপনার ব্যাগ স্ক্যানারে দিতে বলতে পারে, সেটা শেষ হলে আপনার পাসপোর্টে আরেকটা সিল দিয়ে অগ্রসর হতে বলবে। এ দুটো কাজ শেষ হবার পর বাংলাদেশ অংশে আপনার কাজ শেষ।

৭. ভারতীয় ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস: বাংলাদেশ  ও ভারতের মধ্যবর্তী নো ম্যান্স ল্যান্ড পার হয়ে আপনি যাবেন ভারতে ইমিগ্রেশনে। সেখানেও লাইনে দাঁড়ানোর আগে ইমিগ্রেশন কার্ড পূরণ করে নিবেন। কোন একটা হোটেলের ঠিকানা সংগে রাখবেন, সেটার নাম ও নাম্বার দিয়ে ফরম পূরণ করবেন। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারে, যেমন কোথায় কোথায় যাবেন, কোন হোটেলে থাকবেন এ ধরণের। কাজ শেষ হলে এরাইভাল সিল দিয়ে কাস্টমসে অগ্রসর হতে বলবে।

কাস্টমস আপনার ব্যাগেজ চেক করে দেখতে পারে। এছাড়া সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞেস করে রুপি আছে কিনা। আছে বললেই বিভিন্ন ধরণের ঝামেলা করে ও অতিরিক্ত টাকা দাবি করতে পারে। বাংলা টাকা কত আছে সেটাও জিজ্ঞেস করতে পারে। কাস্টমসের কাজ শেষ হলেই আপনার সীমান্তের সব কাজ শেষ।

৮. কোভিড ভ্যাকসিন/টেস্ট: আপনার যদি দুটো কোভিডের টিকা দেয়া থাকে তবে সেই টিকা কার্ড সংগে প্রিন্ট করে রাখবেন। আর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ১২ বছরের নিচে কোন বাচ্চার কোভিড টেস্ট/টিকা প্রদানের সার্টিফিকেটের প্রয়োজন নেই। আপনার বাচ্চার বয়স যদি ১২ বছর হয় এবং টিকা দেয়া না থাকে সেক্ষেত্রে বাচ্চার কোভিড টেস্ট নির্ধারিত সরকারী কেন্দ্র থেকে যাত্রার ৭২ ঘন্টা আগে করে নেগেটিভ সার্টিফিকেট সংগে নিয়ে যেতে হবে।

ফিচার ছবি লেখক

 

 

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

ভ্রমণে সাথে থাকুক সেরা পাওয়ার ব্যাংক

একটা সময় ছিল যখন ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা ব্যাগে কিছু কাপড় ঢুকিয়েই ভ্রমণে বের হয়ে যেতো। প্রযুক্তিগত …

Leave a Reply

Your email address will not be published.