ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: শেষ পরিণতি

আমি আর ওয়াফি বেশ সময় কাটিয়ে ফেলেছি এর মধ্যে৷ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি এর মধ্যে গতিধারা পরিবর্তন করে তুমুল বেগে পড়তে লাগলো৷ আমরা আটক হয়ে গেলাম সীতারামের দূর্গে৷ বাহিরে ভ্যানওয়ালা মামা অসহায় দৃষ্টিতে দরজা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দেওয়া শুরু করেছে৷ তাকে ইশারায় আশ্বাস দিলাম তোমার ভাড়া বাড়িয়ে দিব৷ সে ফিচকে হাসি দিয়ে ফিরত গেল তার ভ্যানের কাছে৷ পুরাকীর্তি মাঝে আটকিয়ে থেকে এমন বৃষ্টি উপভোগ শেষ কবে করেছি৷ যেহেতু আটকিয়ে আছি সীতারামের দূর্গে সীতারামের শেষ পরিণতি জেনে যেতে ক্ষতি কোথায়৷

আহা সীতারাম। ছবি: লেখক

তখন আজিমুশশান বাংলার সুবাদার৷ তিনি তার ঘনিষ্ট আত্মীয় মীর আবু তোরাপকে ভূষানের ফৌজদার হিসাবে নিয়োগ দেন৷ আবু তোরাপ ছিল কুটিল লোক৷ তিনি স্বল্প সময়ে স্থাপন করে ত্রাসের রাজ্যত্ব৷ কর দিতে ব্যর্থ প্রজাদের বলপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করতেন৷ রাজা সীতারাম ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানুষ৷ এই সংবাদ তার কর্ণকূহরে পৌঁছানোর পর মোগল রাজকোষে আর এক টাকাও কর দিবেন না বলে পণ করেন৷ আবু তোরাপের কাণ্ড তার স্বাধীন রাজা হবার ইচ্ছাকে তরান্বিত করে৷ আবু তরাপ এর পরিণত নিয়ে ভূষনা রাজা সীতারামকে হুমকি দিতে থাকে৷ তবুও তার সিদ্ধান্ত এক চুলও নড়াতে পারেনি৷

রাজাবিহীন দূর্গ। ছবি: লেখক

মুর্শিদকুলী খানের সাথে আবু তোরাপের সাপ নেউলে সম্পর্কের কথা জানতেন সীতারাম৷ আজিমুশশান যখন দিল্লিতে অবস্থান করছিলেন তখন তার পুত্র ফররুখসিয়ার ভারপ্রাপ্ত সুবেদার করে যান৷ যে স্বপ্নালু পুরুষ বাংলার থেকে দিল্লির উন্নয়নে বেশি আগ্রহী। বাংলার রাজধানি ঢাকা থেকে পাটনায় স্থানন্তরিত করা হয়৷ তখন কি মৃদু হাসি দিয়েছিল সীতারাম৷ এমতাবস্থায় আবু তোরাপের পক্ষে সুবেদার বা দেওয়ান কার নিকট থেকে সাহায্য পাওয়া সম্ভব ছিল না৷ ক্রোধান্বিত আবু তোরাপ নিজে অস্ত্র তুলে নেয় সীতারামকে শায়েস্তা করার জন্য৷ সে প্রাচীন আমল থেকেই বোধ হয় সব রাজ শক্তির বাঙালির বিরুদ্ধে দৃঢ় ধারনা জন্মেছিল এরা ভীত৷ সম্রাট বাবর প্রথম উপলব্ধি করেন বাঙালির লড়াকু মনোভাব৷ তাই তো তিনি বাবরনামায় লিখে গিয়েছিলেন আম বাঙালিদের দেখে ছাড়বো৷ যাই হোক ফৌজদার আবু তোরাপ স্বল্প সংখ্যক সেনা নিয়ে পেরে উঠলেন সীতারামের সাথে৷

ঐতিহ্য। ছবি: লেখক

১৭১৩ সালে বাংলার সুবাদার নিয়োজিত হয় মুর্শিদকুলী খান। আবু তোরাপ তার কাছে সাহায্য আবেদন করলে বিদ্রূপের হাসি দেয় যেন খান সাহেব। কোন মোগল শক্তি প্রেরণ করেননি আবু তোরাপ কে সাহায্য করার জন্য। একগুঁয়ে আবু তোরাপ মোগল সাহায্য ছাড়াই আর একবার সীতারামের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করেন৷ কিন্তু সীতারামের গেরিলা বাহিনীর কাছে ধোপে টিকলো না আবু তোরাপের বাহিনী৷ এবার তার সিপাহীশালার সেরা সেনাপতি পীর খান কে প্রেরণ করন আবু তোরাপ৷ মোগল গোলন্দাজ বাহিনী অবস্থান নেয় মধুমতির তীরে৷ বারাশিয়া নদীর তীরর মোগল বাহিনী এবং সীতারাম বাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়৷ মীর আবু তোরাপ যুদ্ধের ময়দানে নিহত হয় দুর্বার সেনাপতি মেনাহাতির নিকট। বারাসিয়া নদীর তীর সাক্ষী হয় এক কিংবদন্তির৷ ভূষণা সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয় আবু তোরাপের লাশ৷ ‘তোরাপের মাজার’ বলে কথিত ভূষণা সেনানিবাসে আজও আবু তোরাপ হয়তো চির নিদ্রায় শুয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে৷ তবে আধুনিক বাংলাদেশে তোরাপের মাজারের অবস্থান এখনও জানা যায়নি৷

আলোর ছায়ার মাঝে ঢেকে যায় ইতিহাস। ছবি: লেখক

সীতারাম বাহিনী দখল করে নেয় ভূষণার কেল্লা৷ বাহিনীর এক অংশকে কেল্লায় রেখে বাকি অংশকে নিয়ে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে৷ সীতারামের সেনারা মধুমতি নদীর তীরে অবস্থান নেয়৷ দুর্বার, সাহসী সীতারাম রায় জানতেম মোঘল বাহিনীর সাথে এবার সংঘর্ষ কোন ভাবেই এড়ানো যাবে না৷ এই পরাজয়ের শোধ নিয়ে অবশ্যই মুশির্দাবাদ থেকে আসবে মোগল মূল বাহিনী৷ সীতারাম রায় তার বাহিনীর পদাতিক ও গোলন্দাজ বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকেন।

ঐতিহ্যে পড়েছে শ্যাওলা। ছবি: লেখক

আবু তোরাপের মৃত্যুর খবরে কেপে উঠে মুর্শিদাবাদের মসনদ। মুর্শিদকুলি খান তার শ্যালক বক্স আলী খানকে ভূষণার নতুন ফৌজদার হিসাবে নিয়োগ দেন এবং সীতারামকে দমন করার আদেশ দেন। বক্স আলী খান সকল জমিদারদের সীতারামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মোগল শক্তিকে সাহায্য করার জন্য আদেশ দেন। নতুন ফৌজদারের সাথে ছিলেন সুবাহ বাংলার সেনা প্রধান সংগ্রাম সিংহ। মোগল প্রভুর পা চাটা নিকটবর্তী জমিদারগণ এবং নাটোরের দিঘাপতিয়ার জমিদার দয়ারাম মোগল শক্তির সাথে যুক্ত হল। শুরু হল আবার প্রবল বিরুধ যুদ্ধ। ফৌজদার বক্স আলী সীতারামের ভূষণা দূর্গ আক্রমণ করে বসে। যুদ্ধের প্রথম দিকে দুর্বার প্রতিরোধ করে টিকে থাকলেও শেষের দিকে ভূষণাকে আর দখল রাখা সম্ভব হচ্ছিলো না সীতারামের পক্ষে। সম্মুখসমরে তিনি পিছাতে বাধ্য হলেন। অতঃপর রাতের অন্ধকারে তার সৈন্যদল নিয়ে ভূষণা থেকে তার রাজধানী মোহাম্মদপুরের দিকে আগ্রসর হন। মোগল সৈন্যরাও তার পিছু নিতে থাকে। সীতারাম ঢুকে পড়ে তার দূর্ভেদ্য মোহাম্মদপুর দূর্গে।

যেখানে পড়েছিল তোমার পদচিহ্ন। ছবি: লেখক

আর সেই দূর্গে আজ তিন শতক পর দুই জন পরিব্রাজকে পদচিহ্ন পড়েছে। বসে আছি দূর্গের এক কোনায়, ভাবছি সীতারামের শেষ পরিণিতির কথা। আজ আকাশের মন খারাপ। হয়তো আমরা আসবো ভেবেই আকাশটা আঝোর ধারায় কাঁদছে। ওয়াফি আমি বৃষ্টির ছটা একটু কমার পর বাহিরে আসলাম। দাঁড়িয়ে আছি এখনও ভূষণা রাজার সেই দূর্গের সিংহ ফটকে। কি হয়েছিল সে সময়ে।

মোহাম্মদপুরের দুর্ভেদ্য দূর্গে অবস্থান করে রাজা সীতারাম শেষ বাজির দান খেলে ফেললে। এবার মর না হয় মার। তিনি ভূষণার স্বাধীনতা রক্ষা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। প্রধান সেনাপতি মেনাহাতি তলোয়ার ঝলকে উঠে, ছলাত করে উঠে তার রক্ত, বীরবিক্রমে রুখে দাড়ান মোগল শক্তির বিরুদ্ধে। গড়ে তুলেন দুর্বার প্রতিরোধ। মোগল শক্তির যুদ্ধের জয় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

এখানে মেনাহাতী ধরা পড়েছিল শত্রু সেনার হাতে। ছবি: লেখক

বৃষ্টি এবার পুরোপুরি থেমে গেল। আমরা ফিরেই যাচ্ছিলাম। তবে দাঁড়িয়ে পড়লাম দূর্গের ওপারে সেই দোলমঞ্চ মন্দির দেখে। এই মন্দিরই তো সাক্ষী ছিল মেনাহাতির অসহায়ত্বের, মোগল কুটিলতার। কোন ভাবে না পেরে। ছলের আশ্রয় নেয় মোগল বাহিনী ও তার সর্মাথক গোষ্টী। এ যেন পলাশীর যুদ্ধের বিশ্বাসঘাতকতা পূর্ব মহড়া। সব সময়ই মীর জাফর থাকে, সে সময়ের মীর জাফর ছিল কুচক্রী মুনিরাম। বিশ্বাসঘাতক মুনিরামের পরামর্শে কুটিল জমিদার দয়ারামের সহযোগিতা দোলমঞ্চ মন্দিরে নিকট মেনাহাতি কে পিছন থেকে অতর্কিতভাবে আক্রমন করে আহত অবস্থায় বন্দী করে।

এই সেই দোলমঞ্চ তাকে না দেখে ফিরি কি ভাবে। রাজা সীতারাম নির্মিত সেই দোলমঞ্চ যে সাক্ষী অনেক ইতিহাসের। বর্গাকারে নির্মিত নিচে তার প্রকাণ্ড বেদী উপরে ছিল অপেক্ষাকৃত ছোট দ্বিতীয় ও তৃতীয় বেদী। তৃতীয় বেদীর উপরেই সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে দোল মঞ্চের চূড়া। মোগল ও হিন্দু রীতির অপূর্ব মিশ্রন এই মন্দির। চূড়াটি গম্বুজ আকারের হলেও চতুষ্কোণ ও দীর্ঘাকৃতি ছিল। প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর বেশ ভাল যত্ন নিয়েছে এই দোলমঞ্চ মন্দিরের, তবে কালের গ্রাসে মন্দিরের পোড়ামাটির ফলকগুলো ক্ষয়ে গেছে অনেক আগে।

মন্দিরের সাথে শৈল্পিক ওয়াফি। ছবি: লেখক

বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে ছিলাম দোলমঞ্চ মন্দিরের দিকে। যেন মেনাহাতী এখনই প্রভুর আরাধনা করে বের হয়ে আসবে। সে কি হয়! ৭ দিন পর্যন্ত বন্দী ছিল মেনাহাতী মোগল বাহিনীর কাছে। প্রবল শক্তিশালী মেনাহাতী শত্রু নির্যাতনে বেচে ছিল সাত দিন। সিংহ কে যে আহত হলেও সিংহ। মারা যাবার পর মেনাহাতীর মস্তক ছেদন করে প্রেরণ করা হয় মুর্শিদাবাদ। বিশালকার এই মস্তক দেখে অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকেন মুর্শিদকুলী খান। এত বড় বীরকে হত্যার জন্য তিরষ্কার করেন তার বাহিনীর। তবে ইংরেজিতে প্রবাদ আছে না কার্মা ইস এ বিচ। সেই কর্ম ফলের জন্যই হয়তো পলাশির যুদ্ধ হয়েছিল। মুর্শিদাবাদ থেকে তার মস্তক ভূষণায় ফিরে আসার পর বীরের বেশে তার লাশ সৎকার করে সমাহিত করা হয়। মেনাহাতীর সমাধিচিহ্নটি আজ আধুনিকতার ছোয়ায় চাপা পড়ে গেছে ইট পাথরে বিল্ডিংয়ের নিচে। হায় মেনাহাতী, হায় ইতিহাস বিমুখ সমাজ।

প্রধান সেনাপতির মৃত্যুর পর খানিকটা টলে যান সীতারাম রায়। তবে বাঙালি বলে কথা। আবার গড়ে তুলেন দুর্বার প্রতিরোধ। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মুর্শিদাবাদ প্রেরিত হন। লোহার খাচায় বন্দী করে কুচক্রী দয়ারাম তাকে কুচক্রী দয়ারাম মুর্শিদাবাদ নিয়ে যায়। যেন কোন জন্তুকে বন্দী করে তামাশা দেখানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। দিঘাপতিয়া যাবার কালে পথে যাত্রা বিরতিতে নাটোর রাজবাড়ীর কারাগারে বন্দী রাখা হয় সীতারাম রায়কে। যে কক্ষে তাকে বন্দী করে রাখা হয় তা আজও বিদ্যমান। মুর্শিদাবাদ কয়েক মাস বন্দী করে রাখার পর নবাব মুর্শিদকুলি খান তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। তবে তার মৃত্যু নিয়ে নানান কিচ্ছা কাহিনী আছে সে দিকে আর না বাড়াই। সব গুলোর ইতিহাসিক দলিল বেশ নড়বড়ে।

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সীতারাম উপন্যাস এই রাজা সীতারাম রায়কে নিয়েই। আমরা বাঙালি আমাদের প্রকৃত বীরের কথা স্মরণে রাখি না। নবাব সিরাজউদৌল্লার মত অবাঙালির মূল্যায়ন হয়, মূল্যায়ন হয় না বারো ভূইয়াদের, মূল্যায়ন হয় না সীতারামের মত বীরের। এক রাশ বিষ্মন্নতা নিয়ে যাচ্ছি সীতারামের দূর্গে থেকে। বীর তোমায় সালাম। এবার চলতে হবে যে দক্ষিণের পথে পথে।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

About Ashik Sarwar

Check Also

পায়ে হেঁটে রংপুর বিভাগ ঘুরে দেখা – ৪র্থ দিন।

ট্যাক্সের হাট (বদরগঞ্জ) – পার্বতীপুর – চিরিরবন্দর – দিনাজপুর – বীরগঞ্জ ( ৪১.৫৪ + ২৭.৩২) …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *