Breaking News

মন চলরে লালদিয়ার বনে: চল যাই লালদিয়া সৈকত

আত্মহারা পথিকদের কথার ফিসফিসানিতে বন যেন নতুন করে জেগে উঠলো। ওয়াফিকে বললাম এই যে নতুন তিনজন আসছে এদেরকে সাথে নিয়ে লালদিয়া সৈকতে যাওয়া যায়। সদা অস্থির ওয়াফি বললো এরা যাবে না মনে হয়। তখনও জানা হয়নি তাদের পরিচয়। মজার ব্যাপার পুরা সফরেই জানা হয়নি। সফর শেষে ফেসবুকে অ্যাড করতে গিয়ে জানা হয়েছে নাম। তাদের সাথে প্রথমে কথা বলে মনে হল তাদের তেমন আগ্রহ নেই। ওয়াচ টাওয়ার দেখতে সামনে বাড়ালো। আমরাও হেঁটে হেঁটে সামনের দিকে যাচ্ছি।

জলের জীবন। ছবি: লেখক

এ সময় পিছন দিক থেকে তাদের গলার আওয়াজ শুনলাম। তারাও ফিরে আসছে আবার জিজ্ঞেস করলাম যাবেন নাকি লালদিয়া সৈকতে। ভ্রমণ পিপাসুদের মন আবার অল্পতে ভরে না। তারাও হয়তো এটুকু দেখে শান্ত হয়নি তাই দিক ভ্রান্তের মত আমাদের সাথে যেতে রাজি হয়ে গেলেন। আবার সে খালের ধারে এসে পড়লাম। এখান নৌকা সমেত মাঝি ছিল বেশ কয়েকজন। তবে কথা বলতে আগ্রহী না। বললো সামনে বন বিভাগের টিকেট কাউন্টারে চলে যেতে।

নৌকা তৈরি হচ্ছে। ছবি: লেখক

টিকেট কাউন্টারে আসার পর ঘাটের এন্ট্রি ফ্রি রেখে মাঝির সন্ধান দিয়ে দিল। সে বরাবরের দোকানে বসে চা খাচ্ছে। ৫০০ টাকায় বোট ঠিক করে আমরা আগাতে লাগলাম মাঝির দেখানো পথে, সামনে একটা ব্রিজের মত দেখতে পেলাম। এইটা বনের ট্রেইলের ব্রিজ না। এখানে এসে অনেক গুলো মাছ ধরার ট্রলার, নৌকা দেখলাম। এক পাশে দেখতে পেলাম বরং নৌকা বানানোর দৃশ্য।

ভাসমান জীবন। ছবি: লেখক

আমাদের মাঝি এখন বোট নিয়ে আসেনি তাই ক্যানেলের সৌন্দর্য্যে ডুব দিলাম আমরা। ম্যানগ্রোভ বনের মত এই বনের ক্যানেলগুলো। বেশ সুন্দর ও চারপাশে চির সবুজ। একটু পর দূর থেকে দেখতে পেলাম একটা ইঞ্জিন চালিত বোট আসছে। এইটা আমাদের বোট। তবে যে মাঝি চাচার সাথে কথা বলেছিলাম উনি নেই। উনার ছেলে আমাদের নিয়ে যাবে লালদিয়া সৈকতে। তার সাইড কিক আছে একজন। ছোট মরিচ হলে কি হবে লুঙ্গি পরে বেশ ভাবে আছে। লুঙ্গিতে কোচ দিচ্ছে আবার ছাড়ছে। যাই হক চলতে শুরু করলো আমাদের বোট। 

আহা সবুজ। ছবি: লেখক

ম্যানগ্রোভ বনের নির্জনতা যেন ভর করেছে লালদিয়ার এই ক্যানেলে। আমরা আস্তে আস্তে গহীনে যাচ্ছি মনে হচ্ছে যেন। ক্যানেলের ঘোলা জলে সবুজের ছায়া, মেঘলা আকাশে সাথে বিকট ইঞ্জিনের শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে অদ্ভূত এক নৈঃশব্দে। ভাবালুতার জগৎতে ক্ষণে ক্ষণে উদয় হয় নতুন বৈচিত্র্য। যতই সামনে আগাচ্ছি, পানি ধীরে ধীরে বাড়ছে। জোয়ারের সময় চলছে।

বন্যরা বনে সুন্দর। ছবি: লেখক

ক্যানেলের ভিতর দাঁড়ানো গোলপাতা গাছ মাথা উচিয়ে ম্যানগ্রোভের নির্যাসের জানান দিচ্ছে যেন। গোলাপাতার ফাঁকে ফাঁকে আলোর আধুলি পানিতে পড়ে অদ্ভূত মায়াময় পরিবেশ তৈরি করছে। আবার কোথাও সুন্দরী গাছ তার বিশালতায় আকাশ ছুয়ে হালকা নুয়ে পথিকের পথে চেয়ে ছিল। ম্যানগ্রোভ বনের আত্মা কি ভর করলো লালদিয়ার এই বনে। হবেই বা না কেন। এখান থেকে তো সুন্দরবন বেশি দূরে নয়।

দেখি বিষখালী বলেশ্বরের মোহনা। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

দাদারা সেলফি, ছবি তোলায় ব্যস্ত। আর আমি নিজ ভুবনে হারিয়ে আজ হতে ভুবন চিল। এক সময় সরু এই ক্যানেল প্রসারিত হল দুদিকে। এখন ছোট ছোট ঝোপঝাড়ে, ঘাসের মাঠে দেখতে পেলাম গরু ছাগলের বিচরণ। দূরে দেখা যাচ্ছে অতল জলের মায়াবী খেলা।

চল যাই লালদিয়া সৈকতে। ছবি: লেখক

এক পাশে বলেশ্বর ও বিষখালীর মোহনা অন্য পাশে বে অফ বেঙ্গল। দূর থেকেই তো সমুদ্রে গর্জন শুনা যাচ্ছে। আর সেই দূর দিগন্তে দেখা যাচ্ছে ঝাপসা হয়ে সবুজের আস্তরন। মাঝিকে জিজ্ঞেস করলাম দূরের বনের নাম কি। ওইটা মামা টেংরাগিরির বন। ওখানে যেতে তিন চার ঘন্টা লাগবে। আমি হা হয়ে জিজ্ঞেস করলাম এত সময় কেন লাগবে। সে বললো মাঝ নদীতে ঢেউয়ের তীব্রতার কথা এমনকি নৌকাও ডুবে যেতে পারে।

আমাদের সাইড কিক। ছবি: লেখক

আমরা এসে পড়েছি লালদিয়া সৈকতে। আমাদের মাঝি প্রথমে আমাদের ডানপাশে নামালো। এখানে সবুজের সমরোহ। সুন্দরীসহ অনেক নাম না জানা বৃক্ষ স্বাগত জানায় আমাদের। এখান থেকে আমরা বলেশ্বর বিষখালির সৌন্দর্য্য দেখতে লাগলাম। তবে সাগরে বুনোতা অনুভব করতে হলে যে ডান পাশে যেতে হবে। এখানে আমরা সেলফি, ছবি তুললাম।

উদাসী মানব। ছবি: লেখক

এখানে আশেপাশে বোধ হয় আছে শুটকি পল্লী, বেশ গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ভাগ্যদেবী সহায় বলতে হবে। এখানকার গাছে একটা পিচ্চি বানরের সন্ধান পেলাম। বড় মাসুম বড় আদুরে। কয়জন জেলেকে আশেপাশে দেখলাম। নৌকা ভিড়িয়ে জাল বুনতে ব্যস্ত। তারা জানলো এইটা পোষা বানর। মানুষ দেখলে কিছু বলে না। বনেরা তো বনেই সুন্দর। এভাবেই বানর পোষা যায় খোলা রেখে তা আমার কাছে ছিল না হজম করার ব্যাপার।

বসে উপভোগ করি সমুদ্র। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

বানর মশাইয়ের  কিছু ছবি ঝটপট তুলে নেবার পর সে নিচে নামলো। সত্যিই তো এ বানর মানুষ ভয় পায়। এই তো আমাদের ওয়াফি ছোট বানরকে আদর করছে। বেশ মন নাড়ানো দৃশ্য। ডারউইন থাকলে কে আজ কেঁদে ফেলতেন। গরিলা আর বানরের মহা মিলনের সে ছবি তুলে নিলাম আমার ক্যামেরায়। এবার ওপাশে যাবার পালা। বানরটা আমাদের নৌকা পর্যন্ত এগিয়ে দিল।

নরম মাটিতে নরম দানব। ছবি: লেখক

বামপাশে বিস্তৃত খোলা মাঠের মাঝে অল্প বিস্তর গাছপালা। সামনে নরম মাটি পাড়িয়ে যেতে হয় সমুদ্রের কাছে, নরম মানে স্পঞ্জের মত। পা জোরে ডাবিয়ে দিল কাদা উঠবে না হয় জেলির মত ভাইব্রেশন দিবে। সে পথ পারি দিয়ে এসে পড়লাম লালদিয়ার সৈকতের সামনে। আহা আমাদের সেই লালদিয়া সৈকত।

নাম না জানা ফল। ছবি: লেখক

সাগরের নোনাজল এসে আছড়ে পড়ছে বালুকাবেলায়, এর মাঝেই  গেথে আছে বৃক্ষের শ্বাসমূল। দূর দেখা যায় উড়ে যায় গাঙচিল। আমাদের সাইড কিক সেই ছোট মাঝি লুঙি খিচে দাড়ালো সমুদ্রের পানে। এ রকমে দুর্লভ দৃশ্যের ছবি বুড়ো বয়সে স্মৃতি রোমন্থন করার জন্যও তুলে রাখা উচিত, তাই ক্যামেরা খিচতে দেরি করলাম না।

চল ফিরে যাই। ছবি: লেখক

লালদিয়া সৈকতের মোহিনী জালে আটকা পড়ে গেছি আমরা কজন, কখন যে ঘড়িটা সময়ের দাসত্বের কথা জানালো টেরই পেলাম না। সে জাল ভেদ করে এবার পাথরঘাটা ফেরার পালা। সমুদ্র তুমি তো সেই রূপসী প্রেমিকা যার ছলনায় বার বার আসতে হবে তোমার পানে। বাংলাদেশের কোন অখ্যাত সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচজন পথিক। ভুলে গেছে তারা জীবনের দুঃখ কষ্ট বেদনা। তবে পলাশ দাদাদের সাথে আমাদের গল্পের আড়ি লালদিয়ার বনে শেষ হলেও আমাদের গল্পটি ফুরাতে যে অনেক দেরি পাঞ্জেরি।

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্পগুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

About Ashik Sarwar

Check Also

ভ্রমণে সাথে থাকুক সেরা পাওয়ার ব্যাংক

একটা সময় ছিল যখন ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা ব্যাগে কিছু কাপড় ঢুকিয়েই ভ্রমণে বের হয়ে যেতো। প্রযুক্তিগত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *