ভূষণার রাজা সীতারামের দেশে: রাজা সীতারাম

‘ধন্য রাজা সীতারাম বাংলা বাহাদুর
যার বলেতে চুরি ডাকাতি হয়ে গেল দূর।
এখন বাঘ মানুষে একই ঘাটে সুখে জল খাবে
এখন রামী শ্যামী পোঁটলা বেঁধে গঙ্গা স্নানে যাবে ॥’

ছুটে চলছে আমাদের বাস মাগুরা শহরের দিকে। শহরে নেমেই আবার মোহাম্মদপুর উপজেলার বাসে উঠবো। এবারের গন্তব্য রাজা সীতারাম রায়ের প্রাসাদ দূর্গ। এইটা বলতে গেলে মাগুরা জেলার সবচেয়ে বড় পর্যটক আর্কষণ। যদিও বাংলার আপামর জনতার মন বুঝা বড় দায়। তবে সম্প্রতি বার্তা এসেছিল ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ায় মাগুরার ডিসি সাহেব না কি রাজা সীতারাম রায়ের পালঙ্কে ঘুমান। আরে ঘুমাবে না? সে ও তো জেলার রাজা! তার কি শখ আলহাদ থাকতে পারে না। ভূষণার রাজা সীতারামের কথাই মনে পড়লো তাকে নিয়ে রচিত কবিতাটা। মাগুরা শহরে পৌঁছাতে পারি দিতে হবে অনেকটা পথ। এর মধ্যে না হয় তোমাদের গল্প শুনাই ভূষণা রাজা সীতারাম রায়কে নিয়ে।

মাগুরার ইতিহাসের সাথে ভূষণা যেন একই সূত্রে গাথা। বর্তমান মাগুরার অধিকাংশ জায়গা শতাব্দিকাল যাবৎ ভূষণা রাজার অধীনে ছিল। বৃহত্তর ফরিদপুর ও যশোরের অনেকাংশ নিয়ে ভূষনা রাজ্যের বিস্তার ছিল। তৎকালীন আমলে ধেনুকর্ণ রাজার পুত্রের নাম ছিল বঙ্গ ভূষণ। সেই নাম থেকেই ভূষণা রাজ্যের উৎপত্তি। প্রাচীন কিছু নির্দশন নিয়ে ভূষণা নামে ছোট্ট গ্রামটি এখনও টিকে আছে। যদিও ভূষণা রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটেছে বহু আগে।

ভূষণা রাজার দূর্গে। ছবি: লেখক

সেই ভূষণা রাজ্যেই সীতারাম রায় ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে মধুমতির পাড়ের হরিহরনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সীতারামের পিতা ছিলেন মোগলদের অধিন্যস্ত কর্মচারী। তার জন্মের পর পর তার পিতা ঢাকায় বদলী হয়। আর সীতারাম রায় পড়াশোনা ও অস্ত্র বিদ্যার দিক্ষা এই ঢাকা থেকেই আয়ত্ত্ব করেন। সীতারাম উত্তরাধিকারি সূত্রে মোহাম্মদপুরের জমিদারি লাভ করেন। তবে ভিন্ন সূত্রে থেকে জানা যায় তিনি দস্যু সর্দার হিসাবে জমিদারি জোর করে দখল করেন। এ ব্যাপারে সুনিদিষ্ট কোন তথ্য নেই।

১৪ বছর বয়সে সীতারাম রায়ের রাজ্যত্ব শুরু হয়। দীক্ষাগুরু ইব্রাহীম খান তার শিষ্যের অস্ত্র চালনোর কৌশল ও দক্ষতা অভিভূত হন। তৎকালীন সময় ইব্রাহীম খান মোগল গভর্নর হিসাবে ঢাকায় নিযুক্ত ছিল। সে সময় রাজদ্রোহী আফগান কাসিম খানের দৌরত্যে মোগল বাহিনীর নাভিঃশ্বাস অবস্থা। কাসিম খানকে দমন করার জন্য তাই বালক সীতারামকে দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়। কাসিম খানকে যুদ্ধে পরাজিত করে সবার মন কেড়ে নেয় সেই বিস্ময় বালক। মোগল বাদশাহর হৃদয় জয় করে নেন সীতারাম। পুরষ্কার সরূপ তাকে নলদী পরগণার জায়গী প্রদান করা হয়। অবার অন্য মতে, শায়েস্তা খানের আদেশে সাতৈর পরগণার বিদ্রোহী শাসক করিম খানকে পরাজিত ও নিহত করে বুঝে নেন নলদী পরগণার জমিদারি।

অনমনে ঘুড়ে বেড়ায় লেখক। ছবি: ওয়াফি আহমেদ

সীতারাম রায় বুঝিয়া পাইলেন তারা জমিদারি। এবার গড়বেন নিজের সেনাবাহিনী। মানুষ হিসাবে ছিলেন তিনি অন্য ধাতুর তৈরি। তাই তার বাহিনীতে হিন্দু মুসলিম সবাই খুশি মনে এক সাথে থাকতো। মুসলিমদের তিনি ভাই বলে ডাকতেন। আহা এই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চিত্র আমরা এখন কোথায় খুঁজে পাই। তার বাহিনীতে ছিল মেনাহাতী, রূপচাঁদ ঢালী, বকতিয়ার খান, মৃতরা সিংহ, গোবর দলন প্রমুখ মারকুটে সেনাপতি।

মাগুরা ও ফরিদপুর অঞ্চলে তৎকালীন সময় এক জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন সীতারামের প্রধান সেনাপতি মেনাহাতী। আজও তার বীরত্ব গাথা পুঁথিতে পুঁথিতে ঘুরেফিরে এই অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। তার প্রকৃত নাম রূপনারায়ণ বা রামরূপ ঘোষ। নড়াইল জেলার রায় গ্রামেই তো নিবাস ছিল তার সাত পুরুষের। সেখানেই ছিল মেনাহাতীর বাস। বিরাট হাত, বিশাল মস্তক বিশিষ্ট বিশালদেহী ছোট খাট হাতি স্বরূপ দৈহিক গঠন ছিল বলে মেনাহাতী হিসাবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ভূষণা রাজ্যে। তবে অন্য জনশ্রুতিতে শুনা যায় এই ঘোষ বাবু পিড়ি দিয়ে পিটিয়ে সীতারামের একটি পাগলা হাতি হত্যা করেন বলে তার নাম হইয়ে যায় মেনাহাতী।

পঞ্চ দুয়ার। ছবি: লেখক

রূপচাঁদ ঢালী ছিলেন আরেক সেনাপতি। রূপচাঁদের বংশধর মোহাম্মদপুর উপজেলার খলিশাখালী গ্রামে দীর্ঘকাল বসবাস করে ছিল বলে জানা যায়। আর তার আরেক সেনাপতি শিবরাম চক্রবতীর নামেই মাগুরা শহরে অদূরে আছে একটি গ্রাম। সেই গ্রামের নাম শিবরামপুর। তিনি নিজেই যে শুধু কৃতি পুরুষ ছিলেন তা নয় তার আশেপাশে ছিল সিংহ পুরুষদের বাস।

সীতারাম তার এলাকায় শান্তি প্রতিষ্টার বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন। প্রাচীন কালে মাগুরা ছিল সুন্দরবনের একটি অংশ। বনাঞ্চলের আধিক্যের কারণে ভূষণা রাজ্যে তৎকালীন সময় দস্যু ডাকাতদের উপদ্রব বেড়ে গিয়েছিল। যদুনাথ ভট্টাচার্যের ‘সীতারাম রায়’ গ্রন্থে শ্যামা, রামা, মুস্তো, বিশে, হরে, নিমে, কালা, দিনে, ভুলো, জগা ও জেদো নামে ১২ জন কুখ্যাত ডাকাতের কথা পাওয়া যায়। রাজা সীতারাম রায় ভূষণা, হরিহর নগর, মহম্মদপুর, নলদী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মগ ও ফিরিঙ্গী দস্যুদের কঠোর হস্তে দমন করেন।

আদিমকে জাকাইয়া বসেছি। ছবি: লেখক

এই সব অঞ্চলে দস্যুদের দমন করে ক্ষ্যান্ত দেননি। অধিকান্ত তিনি বাংলার উপকূল অঞ্চলেও মগ ও ফিরিঙ্গী দস্যুদের দমন করার চেস্টা করেন। উত্তর ভারতে তীর্থ যাত্রা যাবার নাম করে সীতারাম রায় দিল্লি যান আওরঙ্গজেবের সাথে দেখা করতে। এই অঞ্চলে দস্যুদের নৈরাজ্যের কথা সম্রাটের কাছে পৌঁছে দেন। এবং তাদের দমন করার ব্যাপারে তার বাহিনী বদ্ধ পরিকর এ কথাও জানান। শান্তির পক্ষে কাজ করার সহযোগিতা আশ্বাস পেয়ে সম্রাট ১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দে রাজা উপাধি ভূষিত করে। শুরু হয় অনুষ্টানিক ভাবে সীতারাম রাজার রাজত্ব।

দিল্লী হতে ফিরে এসে তিনি বাংলার সুবাদার মুর্শিদকুলী খানের সনদ ও অনুমতি নিয়ে উপকূল অঞ্চলে দূর্গ ও সেনা মোতায়েন করে। এই অঞ্চলে ফিরে আসে শান্তি। আজ কালের সাক্ষী হিসাবে সীতারাম রাজার সেই দূর্গটাই রয়ে গেছে মধুমতির তীরে। সুন্দরবন সে তো আজ কত দূরে।

রাজ সিংহ আসন নাই তবে রাজ হংস আছে। ছবি: লেখক

রাজা সীতারাম ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দে মোহাম্মদপুরে তার রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করেন। কথিত আছে সীতারামের জমিদারী পাবনা জেলার দক্ষিণভাগ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এবং নদীয়া জেলার পূর্বপ্রান্ত থেকে বরিশাল জেলার মধ্যভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাজধানীর নাম কেন মোহাম্মদপুর হল সে নিয়েও আছে অনেক কিংবদন্তি। তবে একটি না শুনালেই নয়। অনেকেই মনে করে মুসলিম প্রজাদের মন রাখার জন্য ইসলাম ধর্মের প্রর্বতক হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর নামনুসারে রাজধানির নাম রাখেন মোহাম্মদপুর।

ডুবে ছিলাম ভূষণা রাজার ইতিহাসে। এতটা ডুবে ছিলাম কখন যে বাস মাগুরা শহরে এসে থামলো তা টের ও পেলাম না। বাস থেকে নেমে দেখি দুপুর বারটা বাজে। মোহাম্মদপুর যেতে কমপক্ষে ১ ঘণ্টা লাগবে। তাই দেরি আর না করে ঢাকা বাস স্ট্যান্ডের সামনে অটো করে এসে পড়লাম। এখান থেকেই ছাড়বে মোহাম্মদপুরের বাস। অদূরেই দেখতে পেলাম। দেরি না করে উঠে পড়লাম। বাস হাওয়ার বেগে যাচ্ছে ভূষণা রাজা সীতারামের রাজধানীর পানে। আর আমরা সপ্নালু চোখে দেখছি সীতারামের প্রাসাদ দূর্গ।

About Ashik Sarwar

Check Also

হানিমুনের জন্য দেশের সেরা কিছু গন্তব্য

বিয়ের আগে মানুষের মাথায় প্রথম চিন্তাটা আসে মধুচন্দ্রিমা কোথায় করবে। অনেক নব-দম্পতি ভ্রমণগুরু পেইজে মেসেজ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *