Breaking News

বাইক ট্যুরে বান্দরবান: যাত্রা হলো শুরু

কাপ্তাইয়ের মায়াবী পরিবেশে কর্ণফুলী নদীর সবুজাভ স্বচ্ছ জলের বাধ ভেঙ্গে যাত্রী ও যানবাহনবাহী ফেরিটা যখন এগিয়ে চলছে ওপারের মাটি ছুয়ে দেওয়ার তীব্র বাসনা নিয়ে, ঠিক তখনি আমি উদাস মনে তাকিয়ে আছি উপরে বসন্তের আকাশের দিকে আর ভাবছি ভ্রমণ কিভাবে বন্ধন তৈরি করে দেয়। আসিফ ভাই চট্টগ্রামের মানুষ, কক্সবাজারে জন্ম আর চট্টগ্রামে বেড়ে উঠা। ওনার সাথে আমার পরিচয়টা নাটকীয় ভাবে। সেটা যে এতো গাঢ় হবে ভাবতে পারিনি বোধহয় কেউই। এটাই হয়তো ট্রাভেলিংয়ের মাহাত্ম। কখনো কোন পথের বাকে দেখা হবে অপরিচিত কারো সাথে, হবে পরিচয় গড়ে উঠবে বন্ধুত্ব, হবে আত্মীক সম্পর্ক। আজকে যে ট্যুরের গল্প বলছি সেটা ছিলো আসিফ ভাইয়ের সাথেই। আমাদের ট্যুর শুরু হয়েছিলো চট্টগ্রাম থেকে।

ফ্যামিলি কটেজ। ছবি: প্রশান্তি পার্ক ফেসবুক পেজ

প্রথমদিন আমরা কাপ্তাই প্রশান্তু পার্কে ক্যাম্পিং করি।

দ্বিতীয় দিন কাপ্তাই থেকে যাই বান্দরবান।

তৃতীয় দিন বান্দরবান থেকে আবার কাপ্তাই এসে ক্যাম্পিং।

চতুর্থদিন চট্টগ্রাম ও ঢাকায় ফেরা। 

পরিচয়ের গল্পটা বলা যাক, উনি তখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে পড়েন, গিয়েছিলেন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক বন্ধুর আমন্ত্রণে সিলেট ভ্রমণে। সিলেট থেকে ফেরার পথে শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জের চা বাগানে ঘুরছিলেন শেষের দিনে। আমি তখন চাকরিসূত্রে মৌলভীবাজার থাকি। এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ছোট ভাই আলিফ গিয়েছে আমার কাছে বেড়ানোর জন্য। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওকে নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করি। এর আগে এতো দূর  কোথাও ঘুরতে যায়নি, তাই যা দেখে সেটাতেই খুব আগ্রহ বোধ করে, আমিও আগ্রহী হই ওর মনোযোগ দেখে।    

আজি তোমাকে নিয়ে পাড়ি দেবো। ছবি: লেখক

তো একদিন গেলাম কমলগঞ্জের চা বাগান সংলগ্ন বিভিন্ন স্পটে। ঘুরতে ঘুরতে গেলাম পাত্রখোলা চা বাগানে বীর শ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের শহীদ হওয়ার স্থান দেখতে। আমরা যাওয়ার সময় লোকাল সিএনজিতে গিয়েছি তখন এভেইলেবল ছিলো, কিন্তু সেখান থেকে ফেরার পথে সিএনজি পাচ্ছিলাম না। তাই দুইভাই মিলে হেঁটে হেঁটে সামনে এগোচ্ছিলাম, যদি সামনে কিছু পাই এই উদ্দেশ্যে। কিছু সময় পরে পিছন থেকে ওনাদের সিএনজি আসলো। ওনাদের রিজার্ভ সিএনজি  ছিলো, হাত উঠালাম দেখলাম থামিয়ে নিয়ে নিলো। তারপর গল্পে গল্পে একসাথে মাধবপুর লেকে ঘুরলাম। ওনাদের পরবর্তী প্ল্যানের জন্য বিভিন্ন আলোচনা হলো তারপর ভানুগাছ এসে নেমে গেলাম আমি আর আলিফ। ওনারা চলে গেলেন শ্রীমঙ্গল।

কাপ্তাই-বান্দরবান যোগাযোগ স্থাপনকারী ফেরি। ছবি: লেখক

আমি বরাবর অন্তর্মুখী মানুষ, নতুন মানুষের সাথে খুব সহজে মিশতে পারিনা ফোন নাম্বার আদান-প্রদান তো সম্ভবই হয়না। এটা না হওয়ার ফলে অবশ্য অনেক সময় আফসোসও করতে হয় পরে। আসিফ ভাই নিশ্চই অন্তর্মুখী নয় আমার মতো তাই ফোন নাম্বার দিয়ে গেলেন আর ফেসবুকে এড করে নিলেন, সাথে দিয়ে গেলেন চট্টগ্রামে যাওয়ার দাওয়াত।

সেই থেকে পরিচয়, এরপরে বহুবার দেখা বহু জায়গায় ঘুরাঘুরি একসাথে। একবার সিলেটে আমার বাসায় ওনাদেরকে রেখে আমি ঢাকায়ও চলে এসেছিলাম। ওনার বাসায় গিয়ে আন্টির হাতের রান্না করা মজাদার খাবার খেয়েছি কয়েকবার, এরমধ্যে সবচেয়ে মজাদার আন্টির হাতের রান্না করা শুটকি। চট্টগ্রাম গেলেই বাসায় যাওয়া হয় অথবা বাইরে দেখা হয় আড্ডা হয়। এবার জানুয়ারি থেকে বান্দরবানে ট্যুর দেওয়ার জন্য খুব বলতেছিলেন। ওনার নাকি তখন হাতে ফ্রি সময় আছে, কিন্তু আমার তখন সময় বের করা খুব কঠিন ছিলো। অনেক কষ্ট করে সময় বের করলাম, যেদিন রওনা করার প্ল্যান করলাম সেদিন পড়লো আমার অফিসে নাইট ডিউটি, ভেঙ্গে পড়লাম না। ব্যাগ রেডি করেই ডিউটিতে আসলাম, সারারাত অফিস করে সকাল ৮ টায় অফিস থেকেই বের হয়ে চলে গেলাম সায়েদাবাদ। হানিফ পরিবহনের একটা বাস কাউন্টার ছেড়ে বের হয়ে যাচ্ছে জনপথ মোড় থেকে, দূর থেকে দেখেই দিলাম ভো-দৌড়।

যেনো স্বর্গের সিড়ি। ছবি: প্রশান্তি পার্ক ফেসবুক পেজ

হাত দিয়ে ইশারা দিতেই চালক থামিয়ে দিলো, দৌড়ে গিয়ে টিকেট নিয়ে আসলাম। গাড়িতে উঠে দেখি বাস প্রায় ফাঁকা, তাই হয়তো চালক কিছুটা সুযোগ দিয়েছিলো। ফাঁকা হোক আর যাই হোক আমার বেশ সুবিধাই হলো, জলদি যেতে পারবো এই ভেবে। মেঘনা সেতু বাদে বাকী রাস্তা প্রায় ফাঁকা থাকায় ভালোয় ভালোয় আসলাম। শুধুমাত্র গোলযোগ বাধলো পিছনের সিটে বসা ভদ্রলোকের মোবাইল ফোনে কথা বলা নিয়ে। এতো উচ্চস্বরে কথা বলছিলেন সারা রাস্তা জুড়েই যেনো মনে হচ্ছিলো উনি কোনো নির্বাচনী জনসভায় জ্বালাময়ী বক্তব্য দিচ্ছেন আর বাসের সকল যাত্রী তার শ্রোতা। এই কথা বলার জন্য আর ঘুমাতে পারলাম না। পথিমধ্যে কুমিল্লায় দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়েছিলাম। চট্টগ্রাম আসলাম ৩ টার দিকে, এরমধ্যে আসিফ ভাই বের হয়ে চলে এসেছেন জিইসি মোড়ে। বাস থেকে নামার পরেই পেয়ে গেলাম আসিফ ভাইকে, শুরু হলো ট্যুর।

প্রশান্তি রেস্টুরেন্ট। ছবি: প্রশান্তি পার্ক ফেসবুক পেজ

যেহেতু ক্যাম্পিং করবো তাই তাঁবুসহ অনেক জিনিসপত্র ছিলো সাথে, যদিও বাইকে করে এতোসব জিনিসপত্র নিয়ে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো। বিশেষ করে এতো বড় ব্যাগ কাধে নিয়ে পিছনে বসা কষ্টকর ছিলো। বহদ্দারহাট উড়ালসেতুতে উঠে বন্দর নগরী  চট্টগ্রামকে পিছনে রেখে ছুটে চললাম হ্রদ পাহাড়ের দেশ কাপ্তাইয়ের উদ্দেশ্যে। পাহাড়ে খুব দ্রুত সন্ধ্যা নামে তাই হুট করেই ঝুপ করে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেলো। তখন শীতের শেষভাগ চলছিলো। ঢাকা বা শহর এলাকায় শীত না থাকলেও এখানে শীতের উপস্থিতি ভালোই টের পেলাম। 

মোহনীয় সৌন্দর্যের কাপ্তাই। ছবি: লেখক

সন্ধ্যার সাথে সাথে পৌঁছে গেলাম কাপ্তাই, ক্যাম্প গ্রাউন্ড আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো তাই খুব একটা ঝামেলা হলোনা। অনেকের কাছেই পরিচিত ‘প্রশান্তি পার্ক ও পিকনিক স্পট’ আমাদের ক্যাম্প গ্রাউন্ড। কাপ্তাই এলাকাটার একটা অন্যরকম সৌন্দর্য আছে, পরিবেশটা মায়াবী। কর্ণফুলী নদীর এক পাশে গড়ে উঠেছে এই পার্ক গ্রাউন্ড বিপরীত পাশেই মাথা তুলে দাড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়। চারপাশে বৃক্ষরাজির বিপুল সমাহার এখানে আসলে মনে অন্যরকম এক প্রশান্তির পরশ ছুয়ে যায়।

(চলবে…)

ভ্রমণগুরুতে প্রকাশিত আমার সব পোস্ট দেখতে ভিজিট করুন এই লিঙ্কে:
https://www.vromonguru.com/author/jewel/

About Jewel Rana

Check Also

ভ্রমণে সাথে থাকুক সেরা পাওয়ার ব্যাংক

একটা সময় ছিল যখন ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা ব্যাগে কিছু কাপড় ঢুকিয়েই ভ্রমণে বের হয়ে যেতো। প্রযুক্তিগত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *