Breaking News

সোনালী স্বপ্নের সোনার চর: শেষ থেকে হল শুরু

খুব ভোরে যখন ঘুম ভাঙ্গলো পুরো পৃথিবী ঘোলা ঘোলা লাগলো। সর্বনাশ চোখের চশমা গেল কোথায়৷ তড়াক করে উঠে বসলাম। ভাগ্য সহায় তলপেটে অনুভব করলাম চশমা। চোখ থেকে চশমা কি ভাবে ওখানে গেল বুঝতে পারলাম না৷ ১৯-২০ হলে পড়ে যেতে পারতো ক্যানেলে।

পূর্বাকাশে তাকিয়ে দেখলাম রক্তিম আভা লাভ করেছে। ভোরের সূর্যটা জেগে উঠছে একটু একটু করে। বলতে হয়তো ভুলে গিয়েছিলাম এখানেও কুয়াকাটার মত সূর্য উদয় সুর্যাস্ত এক সাথে দেখা যায়৷ সোনা রোদ্দুর ছোয়ায় আর কি ট্রলারে মন থাকে৷ নেমে পড়লাম সাবধানে। তাঁবুতে গিয়ে যথারীতি দেখলাম মামুন ভাই নাই। রঞ্জু, আলামিন ভাইকে নিয়ে বের হলাম ভোরের সৈকত দর্শনে৷ বনের পথে গিয়ে প্রথমেই মরা শুশুকটাকে খুঁজতে লাগলাম৷ পুরা সৈকতে শুটকির সুবাস যে ছড়িয়েছে তাকে এক ঝলক না দেখলেই তো নয়। দর্শনে রুচি চলে গেল। পেট মুড়িয়ে উঠলেও চোখ জুড়িয়ে গেল ভোরের সমুদ্র দর্শনে।

কি সুন্দর। ছবি: লেখক

দূর দিগন্ত-বিস্তৃত সাগরের অথৈ নীল জলরাশির মাঝে উড়ে যাচ্ছে গাংচিল। উথাল পাথাল ঢেউ মনে এক স্নিগ্ধতায় ভরে দিয়ে গেল। ভোরের সূর্যের প্রথম কিরণের কোমল ছোয়ায় চিক চিক করে উঠছে বালু। দূর থেকে দেখলে পুরা দ্বীপটাকেই সোনালী মনে হবে। তাই কি এর নাম সোনার চর। বিধাতা যেন তার অপরূপ তুলিতে একেছেন পুরা দ্বীপটাকে। সৌন্দর্য্য এর শেষ নাই। এই দ্বীপে না কি আছে লাল কাঁকড়ার বিচরণ। ভাগ্য ভাল হলে দেখা হয়ে যেতে পারে হরিণের সাথেও৷ তবে আমাদের সময় কুলায় নাই বিধায় লাল কাঁকড়াদের সাথে আর দেখা হল না৷ হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি সামনের দিকে। জিয়া আর মামুন ভাই তাদের অস্ত্র নিয়ে ছবি তোলায় ব্যস্ত।

যতই হাঁটছি ততই মনে হচ্ছে কি সুন্দর আমার দেশ৷ সাগরে এখন জোয়ারের সময় ছোট বড় ঢেউ তীরে এসে আছড়িয়ে পড়ছে। ঝুরঝুরে বালি গলে গলে সরে যাচ্ছে অতল গভীরে। পিছে ঝাউবন আর ঘন সবুজ অরণ্যে ঘেরা নিবিড় ছাউনি। কিছু দূর হেটে গিয়ে সন্ধ্যান পেলাম পাকা টয়লেটের। কিছুটা আন্দাজ করতে পারলাম জেলেরা প্রাকৃতিক কাজ সারতে বোধহয় এই টয়লেট ব্যবহার করে।

গাছের শ্বাসমূল। ছবি: লেখক

সাত সকালে দেখা পেলাম কালকের সেই বুনো মহিষের পালের সাথে। মনের আনন্দে তারা ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে এই বালুচরে৷ অতি ভীতু টাইপের প্রাণি এই বুনো মহিষ। তবে দূর থেকে বড় বড় চোখে চেয়ে থাকে অদ্ভূত এক মায়ার জন্ম হয় ভিতরে। আহারে তোকে যদি একটু আদর করতে পারতাম। কিছুদূর গিয়ে ধরে ফেলতে পারলাম মামুন আর জিয়া ভাইকে।

নিরীহ প্রাণী। ছবি: লেখক

দ্বীপের একবারে শেষ মাথায় কাশফুলের গালিচায় বইছে ভোরের বাতাস। প্রকৃতির পুত্রদের এই ছবিগুলা না তোলা হলে তো জীবন বৃথা। এমন জন-মানবহীন সমুদ্র সৈকত আর আশপাশের পরিবেশ দেখে ভেবে বসেছিলাম দ্বীপটির মালিক আমি পাণ্ডা বাকি সব আমার গোলাম। সাবেক প্রেমিকার দেওয়া নাম চিপকিয়ে গেছে জীবনে ওতপ্রোতভাবে৷ মায়াময় পরিবেশে সময় কাটিয়ে এবার ক্যাম্প সাইটে ফেরার পালা৷ ফিরেই হালকা উপর ঝাপসা ফ্রেশ হয়ে অপেক্ষার মাঝে ক্যানেলে গোসল সেরে নিলাম।

বেলাভূমি। ছবি: লেখক

এরপর তাঁবু গুছিয়ে ফুলবাবু হয়ে অপেক্ষায় রইলাম ট্রলারের৷ ট্রলার আবার গিয়েছে বন বিভাগের বিট রেঞ্জে নাম লিখিয়ে আসতে। আগের দিন তাড়াহুড়োয় এই কাজটা সারা হয় নাই। ট্রলার যখন ফিরে এল সবার ডাক পড়লো খিচুড়ি ডিম দিয়ে নাস্তা সারার জন্য। আগের দিনে সবাই এত ক্লান্ত ছিল বারবিকিউ আর হয় নাই। রাতে না খেয়েই দিয়েছে সবাই সুখের ঘুম। তাই বেশ মজা করে সবাই সকালের নাস্তা খেলাম। জাহিদ ভাই বললো লেমেনেড করা ইলিশ ঝোল করে ঝোলা ইলিশ হবে। ভোলায় আসার পর থেকে যে হারে ইলিশ খাচ্ছি ইলিশের প্রতি এক রকম অভক্তি এসে পড়েছে৷ আমরা খাচ্ছি আর দেখছি ইতিমধ্যে আমাদের দুপুরের খাবার রান্না করার প্রিপারেশন নেওয়া হচ্ছে। হয়ে গেলে আর থামাথামির মধ্যে নাই।

ধূসর সবুজ। ছবি: লেখক

খিচুড়ি খেয়ে ঢেকুর তুলে ট্রলারের ছাদে ছিলাম বসে। হঠাৎ মামুন ভাইয়ের কনুইয়ের ধাক্কায় ফিরে তাকালাম। ও মাই গড মাউচ্ছা রানী শিকার মুখে। আমাদের দেশে একে এই নামেই ডাকে। বাংলা ভাষায় বিষহীন জলঢোঁড়া সাপ। হলুদাভ সাদাটে রঙের সঙ্গে দেহের উপরিভাগ জুড়ে বাদামি বা কালো রঙের চারকোণা দাগ। দেহের নিচের অংশ সাদাটে। মাথার রঙ বাদামি। চোখের নিচে থেকে ওপরের ঠোঁট পর্যন্ত কালো একটা রেখা অবয়ব। আগে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে ওয়াইল্ড লাইফ দেখেছি আর আজ বাস্তবে লাইভ দেখছি৷ মাউচ্ছা রাণী তার শিকার আস্তে আস্তে গিলে খাচ্ছে৷ আর আমাদের মামুন ভাই রেকর্ড করছে৷ আমি এতটা বিমোহিত ছিলাম ছবি ভিডিও করার কথা মনেই ছিল না।

বিদায় সোনার চর। ছবি: লেখক

ঠিক এগারটার দিকে আমরা ক্যাম্প গুটিয়ে রওনা হলাম, বিদায় সোনার চর তুমি থাক সুখের স্মৃতিপটে। তবে ফিরে আসাটা ছিল না এতটা মধুর। মাঝ সমুদ্রে ট্রলার নস্ট হয়ে জন্ম দিয়েছিল আর এক রোমাঞ্চ। পড়ে দূর থেকে মাছ ধরার ট্রলার আমাদের উদ্ধার করতে আসে। শুভর সাদা শার্টের বানানো পতাকার সিগনাল পেয়েছিল বিধায় বাঁচা। না হলে কত ঘাটের জল যে খেতে হত আল্লাহ মালুম।

‘আমাদের গল্পটি ফুরালেও ফুরায় নেই কিছু কথা। যা বলা একান্ত প্র‍য়োজন। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। এই জীব যখন ধংসলীলায় মেতে উঠে তখন প্রকৃতি মাকে, রক্ষা করবে কে। দেশ যদি মা হতে পারে দেশের প্রতিটা ভূখণ্ড আমার মা। আপনার মাকে ময়লা করতে একটু কি বিবেকে বাধবে না। এই নির্জন চরেও খুঁজে পেয়েছি কোন পিকনিক করতে আসা গ্রুপের শেষ চিহ্ন। আপনি যে একটা মূর্খ মানব এই বনের প্রাণীগুলোও মনে হয় ওদের ভাষায় বলে। জনমানবহীন চর থাকুক না আপনাদের স্পর্শ ছাড়া কিন্তু টিওবির কল্যানে কোন কিছুই বেশিদিন গোপন থাকে না। ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে পৌঁছে যায় বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে। তাই লেখা শেষের পর এত নাতীদীর্ঘ রচনা।’

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

About Ashik Sarwar

Check Also

ভ্রমণে সাথে থাকুক সেরা পাওয়ার ব্যাংক

একটা সময় ছিল যখন ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা ব্যাগে কিছু কাপড় ঢুকিয়েই ভ্রমণে বের হয়ে যেতো। প্রযুক্তিগত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *