Breaking News

সোনালী স্বপ্নের সোনার চর: যাত্রা হল শুরু

পাখির কিচিরমিচির ডাকা ভোরে ঘুম ভাঙ্গলো। একটু একটু করে আলো ফুটছে চারপাশে। শুয়ে শুয়ে দেখছি আলোর বিস্তার৷ মামুন ভাই আমি এক তাঁবু শেয়ার করেছিলাম। পাশে উনাকে পেলাম না। খুব ভোরে ছবির ভাল সাবজেক্ট পাওয়া যায় বিধায় ছবি পাগল মামুন ভাইকে পাওয়া যায় না৷ তাঁবু থেকে বের হয়ে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের টানে একটু বের হলাম৷

ঘড়ির কাটায় সাড়ে ছয়টা৷ গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলছি৷ ভোরের শুভ্রতায় আদি দিগন্ত সবুজ কচি ঘাসের প্রান্তরে পা ফেলে শিশিরের প্রথম বিন্দু অনুভব করলাম৷ দূরে সবুজের অরণ্যে মাঝে পাখির কলরবে আর ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে আমার প্রাণ জুরিয়ে যাচ্ছে।

পরিষ্কার আকাশ, লিলুয়া বাতাস। ছবি: লেখক

পায়ের নিচে শর্ষে নিয়েই মনে হয় আমার জন্ম। এই জীবনে আর স্থিরতার দেখা পেলাম না৷ ভোলা, পটুয়াখালি অঞ্চলে নারিকেল গাছটা মনে হয় অতি কমন। হাঁটার পথেই পাওয়া যায় তাহার দেখা৷ মাথা উঁচু করে ধনুকের মত তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে৷ এত সুন্দর সকালের মত যদি দিনটাও সুন্দর হত তাহলে কোন কথাই ছিল না৷ আর একটি মিস ম্যানেজমেন্টময় মারা খাওয়া দিনের শুরু সেই গল্পটা না হয় নাই বললাম গুরু৷

জীবন সংগ্রামে জলপুত্র। ছবি: লেখক

ডুবে থাকা যাক না হয় প্রকৃতির মাঝে। শরতের সকাল। আহা রবি ঠাকুরের মতই বলতে ইচ্ছে করে, ‘কালো মেঘের আর কি আছে দিন, ও যে হলো সাথী হীন’। তবে কালকের মারা মনে ক্ষণে ক্ষণে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে ভাদ্র মাসেও তো কালো মেঘ হল না সাথীহীন, কবি গুরু বেঁচে থাকলে কি বলতেন ধিক মানব তুই হয়ে যা বিশ্ব থেকে বিলীন। বিলম্বিত বর্ষায় শরতের সোনা আলো নিভিয়ে দিয়ে দখল করে নেয় মেঘপুঞ্জি মালা, হঠাৎ হঠাৎ ধেয়ে আসবে কালচে ধূসর মেঘ মানুষ এবার সামলা। যাই হক আমাদের দলবল নিয়ে রওনা হলাম সকালের নাস্তা খেতে সেই আদি ও অকৃত্রিম হানিফ হোটেল।

ওরা আমার বন্ধু, চর মন্তাজে লেখক। ছবি: আরিফ মামুন।

সকালে নাস্তা সেরে অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় ২-৩ ঘণ্টা পারি দেবার পর পেলাম আমাদের কাঙ্খিত ট্রলার। চর মন্তাজ থেকে আজ এসেছে আজ আমাদের ঘুম ভাঙ্গাতে৷ কুকরি মুকরি থেকে রওনা দিতে দিতে ১২ টা বেজে গেল৷ চলছে ট্রলার আদি দিগন্ত জলের রাজ্য পার হয়ে। কাঠফাটা রোদ আলোর মাঝে প্রকৃতি মেতেছে আজ আপন রঙে রাঙ্গাতে৷ গ্রামের পর গ্রাম পার হয়ে পথের ক্লান্তির মাঝে চলছে আমাদের অদ্ভূত কাফেলা।

জলপুত্ররা জাল বুনছে নদীর পাড়ে। সোনা রোদে রুপালী ইলিশের স্বপ্নে বিভোর জলপুত্রদের নৌকাগুলো আজ চলছে নতুন উদ্যোমে। আজ আকাশ পরিষ্কার৷ বর্ষা ভিজে এল যেন শরতের আহ্বান৷ প্রকৃতি রং ছড়াছে সৌন্দর্য্যের। শরতের নীল আকাশে পেজা তুলোর মত মেঘ ভাসছে। জলের জীবন দেখতে দেখতে চলে এলাম চর মন্তাজের মার্গারেট সাইডে৷ ট্রলার থামলো।

ওরে সবুজ, ওরে আমার কাচা। ছবি: লেখক

এখান থেকে ডেকোরেশন আইটেম নেওয়া হবে৷ ঘড়িতে দুপুর দুইটা৷ তপ্ত রোদে মহিষের দল নেমেছে তেতুলিয়ার বুকে৷ আর আমরা টিনের দোকানে বসে খাচ্ছি চা বিস্কুট কলা রুটি। আধা ঘণ্টা পর ফিরে এল মহাজনরা। আবার রওনা হলাম বিকাল প্রায় ৪ টার দিকে চর মন্তাজ এসে থামলাম৷ এখান থেকে নেওয়া হবে আমাদের রান্না বান্নার মাল মসলা। প্রায় এক ঘণ্টার কাছাকাছি অপেক্ষার মাঝে দেখে নিলাম চর মন্তাজবাসীদের জীবন যাত্রা। ট্রলারে দীর্ঘ যাত্রায় খাতির জমে গেছে জিয়া ভাই, শুভাশিষদা, আলামিন ভাইসহ আরও অনেকের সাথে।

এর মাঝে আমার গণেশ’দা জিয়া ভাইয়ের কথা বলতেই হয়৷ এত রাগ নিয়ন্ত্রণ করে রাখে কি ভাবে সে এক রহস্য৷ সর্বদা হাসি-খুশি মানুষ। গল্পের আসর জমে গেছে। স্থানীয় মানুষের সুখদুঃখের প্যাঁচাল শুনতে শুনতে দেখতে পেলাম আসছে আমাদের লিডার এবং তার মডরেটর গোষ্ঠী। ঘড়িতে পাঁচটা এবার নেই কোন বিরতি। গন্তব্য সোনার চর।

আকাশের গাঁয়ে কি সত্যি টক টক গন্ধ। ছবি: লেখক

চর মন্তাজ থেকে সোনার চর যেতে বেশি সময় লাগে না। তেতুলিয়া নদীর উথাল পাথাল স্রোতের মাঝে চলছে আমাদের ট্রলার। খুব কাছেই সাগর ঢেউ দেখেই বুঝা যাচ্ছে৷ বিশ মিনিট পর ট্রলার একটা ক্যানেলের ভিতর ঢুকে গেল। আর আমরা দ্বিতীয়বারের মত প্রবেশ করলাম এক সম্মোহক জগৎতে৷ দুই পাশের মানগ্রোভ গাছের সারি আর তার শ্বাসমূল, উপরে খোলা আকাশের রিফ্লেকসন পড়ছে ক্যানেলে৷ সবুজের স্বর্গরাজ্যের মাঝে যেন হারিয়ে গেলাম৷

পিনপতন নিরবতার মাঝে কোন একটা বোধ আছে। শূণ্যতার মাঝে এক প্যারালাল জগতে যেন আটকে গেছি৷ যেন আমাদের জানাচ্ছে আহ্বান। মানুষবিহীন এই সোনার চরে তোমাকে স্বাগতম হে পথিক। মাঝি চাচার কল্যানে বাবলা আর হরগোজা গাছ চিনতে পারলাম৷ এ যেন সুন্দরবনের আর এক প্রতিচ্ছবি। ভোলা, পটুয়াখালি, বরগুনায় অঞ্চলে লুকিয়ে আছে গোপন সৌন্দর্য্য যা সহজে পড়ে না পথিকের চোখে৷

আড্ডায় ব্যস্ত কাফেলা। ছবি: লেখক

থাক না কিছু সৌন্দর্য্যে পথিকের আড়ালে৷ মানুষবিহীন চর থাকুক মানুষের স্পর্শের বাহিরে৷ ফরেস্ট বিট অফিসে প্রথমে থামানো হল আমাদের ট্রলার৷ তখন প্রায় সন্ধ্যা৷ বিট অফিসার আমাদের মামুন ভাইয়ের চাচাতো ভাই৷ কাকতলীয় ব্যাপার। তার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে ট্রলার আগে বাড়ালাম। খানিকটা দূর এসে বন বিভাগে শান বাধা ঘাটে আমাদের ট্রলার ভিড়ানো হল। আর আমরা দীর্ঘ যাত্রা শেষে আড়মোড়া ভেংগে নেমে পড়লাম৷ আজ প্রকৃতির বুকে নেমেছে সন্ধ্যা আর আমাদের পায়ের স্পর্শ পেল কাঙ্খিত সোনার চর৷

আমার পুরানো ভ্রমণ গল্প গুলো পড়তে চাইলে নিচের লিংকে চলে যান:
https://www.vromonguru.com/author/ashik/

আমার গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ পড়তে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ থেকে:
https://www.facebook.com/sarwar.ashik786

এর বাহিরেও আমাদের নিজস্ব ভ্রমণ গ্রুপ শেকড় সন্ধানীর মাধ্যমে নিয়মিত এ রকম বাংলার পথে ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। ইচ্ছা থাকলে পাঠক আপনিও হতে পারেন আমাদের পরবর্তী ভ্রমণের সঙ্গী। আমাদের সাথে যোগাযোগের বিস্তারিত নিচে দেয়া হলো।

Roots Finder – শেকড় গ্রুপের সাথে থাকুন:
https://www.facebook.com/groups/459880764416865/

Roots Finder – শেকড় পেজ লিঙ্ক:
https://www.facebook.com/rootsfinder.bd/

শেকড় সন্ধানী দলের এডমিনদের নাম্বার:
ঈসমাইল হোসেন – ০১৭৫৬১৭১৫৭০
আশিক সারওয়ার – ০১৮৬৬৬৬৩৪২৩
শরীফ জামান – ০১৫৩৫৪৫৩৯৭৭

ঘুরেন দেশের পথে, খুঁজে ফিরুন নিজের শেকড়।

About Ashik Sarwar

Check Also

ভ্রমণে সাথে থাকুক সেরা পাওয়ার ব্যাংক

একটা সময় ছিল যখন ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা ব্যাগে কিছু কাপড় ঢুকিয়েই ভ্রমণে বের হয়ে যেতো। প্রযুক্তিগত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *