কয়েকমাস আগেই পরিকল্পনা করেছিলাম – এ বছর ঈদের ছুটিতে দার্জিলিং, সিকিম, সান্দাকফু আর পেলিংয়ে ভ্রমণের। গ্রীষ্মের গরমে আর রোদে চারপাশের প্রকৃতি অস্থির রকমের তেঁতে আছে। আমাদের দেশের খুব কাছেই দার্জিলিংয়ে রয়েছে অনেক শান্ত, শৈত্য, আর অপূর্ব প্রাকৃতিক নিসর্গ ভ্রমণের বিশাল আয়োজন। দার্জিলিং – যেখানে আমাদের বসবাস সে পৃথিবী থেকে ৭ হাজার ফুট উপরের শৈল শহর ।যেখানকার চার পাশের ভোর কুয়াশায় মোড়ানো আর রাতগুলো বরফ পানিতে ধোঁয়া। তিব্বতীয় শব্দ দর্জি বা বজ্রের দেশ দার্জিলিং। অন্যকথায় উপজাতি লেপচাদের বক্রদেবতা দোর্জের বাসভূমি এ দেশ।

রংপুরের বুড়িমারী সীমান্ত হয়ে অল্প সময়েই এক সকালে রওনা হয়ে যেন লাফ দিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় ভারতের পাহাড়ী চূঁড়ার শৈল শহরে। এক সময়ে সিকিমের অধীনে ছিল পাহাড় আর বনভূমি ঘেরা এই নেপালী ভূটিয়া জনপদ। মূলত ইংরেজদের অবকাশকালীন স্থান হিসেবে দার্জিলিং বা হিমালয় পাহাড়ের এলাকা প্রতিষ্ঠত হয়। ১৮২৯ সালে ইংরেজ সেনা অফিসার লয়েডের আবিষ্কারের পর তাঁর পরিকল্পনা ও নকশায় পাহাড় কেটে কেটে গড়ে উঠে এ ভিক্টোরিয়ান স্যানেটোরিয়াম বা স্বাস্থ্য নিবাস।

নিউ জলপাইগুড়ি বা এনজেপি স্টেশন সংলগ্নে টয় ট্রেনের রেপ্লিকা আছে। বাষ্পচালিত বা কয়লাচালিত ইঞ্জিন দ্বারা শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পৌঁছাতে ৯-১০ ঘণ্টা সময় লাগলেও বর্তমানে ডিজেলচালিত ইঞ্জিন দ্বারা টয় ট্রেনে ৬-৭ ঘণ্টা সময় লাগে। আর ট্যাক্সিতে গেলে (HILL CART ROAD ধরে) সময় লাগে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা।
বুড়িমারী থেকে অটোতে প্রায় ঘণ্টা চারেক সময়ের দূরত্ব অতিক্রমের পর শিলিগুঁড়িতে এসে জীপ অথবা ট্রেনে দু’ভাবেই দার্জিলিং যাওয়া যায়। তবে সময় বেশি লাগলেও বিশ্ব ঐতিহ্যের টয়ট্রেনে এঁকে বেঁকে পাহাড় অতিক্রম করার মজা অন্যরকম। সিটি বাজিয়ে কু – ঝিক ঝিক ঝিক শব্দে একরাশ কয়লার গুড়ো ছিটিয়ে ট্রেন শিলিগুঁড়ি শহরের পাশ কাটিয়ে এঁকেবেঁকে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে উপরে উঠে যায়। দৃষ্টি সীমায় একের পর এক বিস্ময়! পাহাড় কেটে কেটে কারুকার্যময় টিনের চালায় ছোট ছোট কাঠের বাড়ির সামনে-পাশে-কিনারে ফুলের বাগান। বেগুনী, হলদে, ম্যাজেন্ডা কোনটা বা হলদে। কোথাও আবার প্রান্ত আলো করে ফুটে আছে টিউলিপ, রডডেনড্রন, অর্কিড, লিলি।
দার্জিলিংয়ের খাড়া উঁচু রাস্তার একদিকে নিচে ঘোর লেগে থাকা ধুয়াশায় গভীর খাদ, অন্যদিকে দূর চক্রাবালে মিশে থাকা ঢেউ খেলানো পাহাড়। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া সাদা নীল মেঘ, শীতের চাঁদরে ঢাকা অপূর্ব নিসর্গ। ট্রেন চলে স্থির গতিতে। কখনও কখনও ট্রেনটিকে পেছনে যেতে হয় ব্যাক গিয়ারে, পাহাড়ের গা ঘেঁষে। সামনে-পাশে-পেছনে আকাশ ছুঁয়ে আছে উঁচু নিচু খাঁজ কাটা সাদা মেঘের ধাপে। পাইন – ওক বনের গাঁয়ে সবুজ অন্ধকারের আভাস ।মনে মনে অমোঘ রোমাঞ্চকর সোনালী রঙের চূড়া -কাঞ্চনজঙ্ঘার আকর্ষণ। দুপুর গড়িয়ে বিকাল, সামনে কার্সিয়াং ষ্টেশন। উচ্চতা পৃথিবীতে থেকে পাঁচ হাজার ফুট উঁচুতে। পাহাড়ী রাস্তায় পিঠে ব্যাগ নিয়ে ক্ষুদে পণ্ডিতরা কনভেন্ট স্কুল থেকে ফিরে যাচ্ছে ডর্মেটরিতে।

পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভাঙছে ছোট্ট বন্ধুদের পায়ের শব্দে আর পাহাড়ী ফুলের সৌন্দর্যে। রঙ বেরঙের গাঢ় রঙিন ফুল কার্সিয়াংয়ের পাহাড়ের গাঁয়ে গাঁয়ে জড়িয়ে আছে। ক্রমশ গন্তব্যের দুরন্ত কমে আসে। গতির সাথে সময় পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে ট্রেন। সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকাল। শীতের তীব্রতা বাড়তে থাকে। গায়ে জড়াতে হয় একের পর এক শীতের কাপড়, উলের চাদর, মাফলার, জ্যাকেট – এসব যত কিছু। ফুলের গাঢ় রঙ ভ্যালভেট – সার্টিন কাপড়ের মত উজ্জ্বল, চকচকে। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিলেই যেন হাতে রঙ উঠে আসে। দার্জিলিং জুড়ে আছে দেশ বিদেশের ছোট শিশু আর রঙ বেরঙের ফুলের মেলায়। জেরানিয়াম, প্রিমুলা, পোটেনটিলা, হিমালয়ান ব্লু পপি, লিলিয়ান – এ রকম কত জানা-অজানা ফুল ফুটে আছে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আর উপত্যকায়।

দর্শনীয় অনেক কিছুর পশরা রয়েছে দার্জিলিংয়ে । এভারেষ্ট শৃঙ্খ ছোয়ার স্বপ্ন যাদের তাদের জন্য রয়েছে তেনজিং নোরগে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনষ্টিটিউট। পাহাড় জয়ের প্রশিক্ষণ চলে সেখানে । প্রাচীন স্থাপনা – বৌদ্ধ মনার্কি, গুম্ফা, পৃথিবীর উচ্চতম রেলওয়ে ষ্টেশন ঘুম, বাটাসিয়া লোপ, টাইগার হিল, উঁচু নিচু পাহাড়ে পাত্থরে বাগান – রক গার্ডেন, গঙ্গা মায়া গার্ডেন, সুবাস ছড়ানো ঐতিহ্যবাহী সুগন্ধী দার্জিলিং চা, চিড়িয়াখানার সাদা বাঘ, ন্যারো গেজে কয়লায় চালিত হেরিটেজ টয়ট্রেনের ঝিক ঝিক শব্দ – ভ্রমণ পিয়াসীদের জন্য অ্যাডভেঞ্চারের আমেজ ছড়িয়ে আছে দার্জিলিং এর পাহাড়ী বাতাসে, পথে পথে।
লেখক, প্রাবন্ধিক ও পরিবেশবিদ। প্রকাশিত বই ‘আমার মেয়ে: আত্মজার সাথে কথপোকথন, ৭১ মুক্তিযোদ্ধার মা, বাংলাদেশের উপকূল: পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য, জীবনীগ্রন্থ সরদার ফজলুল করিম, সম্পাদনা: সরদার ফজলুল করিম দিনলিপি, মাঃ দুইবাংলার সাহিত্য সংকলন, শিশু বিশ্বকোষ ইত্যাদি।
ফিচার ছবি সবুজ
ভ্রমনগুরু your travel adviser