তানিয়া কামরুন নাহার
পুরান ঢাকা মানেই যেন সরু সরু সব অলিগলি, পুরোনো সব ঐতিহাসিক বাড়ি, মজাদার সব বিশেষ খাবার আর ঢাকাইয়া ভাষার সমাহার। চীনের গুয়াংজু শহরের ইয়ংকিংফ্যাং—এই জায়গাটার অলিগলিতে ঘুরতে ঘুরতে আর এর ইতিহাস শুনতে শুনতে মনে হলো, এটিও যেন এক রকম “পুরান ঢাকা”! আসলে চীনা ভাষায় জায়গাটির নাম মনে রাখতে কষ্ট হচ্ছিলো। তাই সহজে মনে রাখার জন্য আমি এর নাম দিয়ে দিলাম “চীনের পুরান ঢাকা”।
হ্যাঁ, আমাদের পুরান ঢাকার মতোই এই ইয়ংকিংফ্যাং-এও রয়েছে অলিগলি, পুরোনো ঐতিহাসিক বাড়ি, মজাদার বিশেষ খাবার আর ক্যান্টোনিজ ভাষার সমাহার। চীনে ম্যান্ডারিন ভাষায় বেশিরভাগ নাগরিক কথা বললেও তাদের ভাষাতেও রয়েছে নানা রকম বৈচিত্র। এখানে রয়েছে ক্যান্টোনিজ ভাষার আধিপত্য। ওদের এই পুরোনো জায়গাটি ক্যান্টোনিজ সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের পরিচয় তুলে ধরে।
পুরোনো বাড়িগুলোতে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী তামা ও কাঠের খোদাইকৃত কারুকার্য। চীনের এই “পুরান ঢাকা” ঘুরতে ঘুরতে নিজেদের পুরান ঢাকার বেহাল দশার কথা ভেবে মনটা খারাপই হয়ে গেলো। আমাদের পুরান ঢাকার বাড়িগুলো বেশিরভাগই প্রায় ধংসস্তুপ। কোনটা বেদখল হয়ে গেছে। সঠিক কোন রক্ষণাবেক্ষণ নেই। অনেক বাড়ি ভেঙে ফেলার সাথে সাথে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে এর ইতিহাস! আর চীন সরকার ইয়ংকিংফ্যাং-কে ঢেলে সাজিয়েছে।

পুরোনো সব বাড়িগুলোকে নতুন ভাবে সংস্কার করে পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থানে পরিনত করেছে৷ পুরান ঢাকার মতো এ জায়গাটির বয়সও কয়েক শতাব্দী৷ এখানকার বাড়িগুলোর পুরোনো ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায়, এক সময় বাড়িগুলো আমাদের পুরান ঢাকার মতোই জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছিলো। অথচ সংস্কারের পর ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক মেলবন্ধন রচিত হয়েছে এখানে। তাই জায়গাটিকে নিয়ে প্রতিপাদ্য হচ্ছে—পুরোনো শহর, নতুন উদ্দীপনা (Old city, New spirit)।
এখানকার স্থাপত্যশিল্পে একইসাথে ক্যান্টোনিজ ও ইউরোপীয় ধারা বহমান। কিছুক্ষণ ক্যান্টোনিজ অপেরা উপভোগ করলাম। একটি উন্মুক্ত জলাশয়ের ওপর অপেরার মঞ্চটি নির্মিত। রঙিন মাছেরা খেলছে জলাশয়ে। চমৎকার খোলামেলা প্রাকৃতিক একটি প্রশান্তিময় পরিবেশ বিরাজ করছে অপেরা পরিবেশনের স্থানটি জুড়ে। ওদের অপেরা শুনতে শুনতে মনে হলো, পৃথিবীতে সব আবেগ অনুভূতির ভাষাই এক রকম। সম্পূর্ণ অচেনা ভাষার গীতিনাট্যটিতে তরুণ অভিনেতা তার প্রণয়াকাঙ্ক্ষার কথা যে তরুণী অভিনেত্রীকে জানাচ্ছেন, সে কথা খুব সহজেই অনুভব করলাম। অপেরার জলাশয়ের প্যাসেজটি ধরে এবার প্রবেশ করলাম জাদুঘরে৷

জাদুঘরের প্রবেশমুখেই চোখে পড়লো বিশাল দরজায় ভয়ংকর দর্শন দুই বিশাল দেবতা! তারা নাকি দ্বারদেবতা (Door god)। ওরে বাবা! এক রাজা নাকি রাতে কিছুতেই ঘুমাতে পারতেন না৷নিজ ভাই বেরাদার, আত্নীয়স্বজনদের হত্যা ও বিতাড়িত করে নিজে সিংহাসন দখল করে হয়েছেন রাজা। বিবেকের তাড়নাতেই হয়তো তার ঘুম আসতো না। ভয় পেতেন তার শত্রুরা হয়তো ঘুমের মধ্যেই আক্রমণ করবে৷ অবশেষে তিনি বুদ্ধি করে এই দুই ভয়াল চেহারার দ্বারদেবতাদের ছবি এঁকে রাখেন শহরের আর প্রাসাদের প্রবেশমুখে। এরপর থেকে রাজার ঘুমের সমস্যা মিটে গেলো।
মিথ শুনে আমার মনে হলো, কাকতাড়ুয়া দিয়ে ফসলি জমির পাখিকে যেমন তাড়ানো হয়, এ যেন অনেকটা তাই। সত্যি, দেখে যে কারো মনেই ভয় জাগবে। তবুও দ্বারদেবতাদের ভয় উপেক্ষা করেই জাদুঘরে প্রবেশ করলাম। নানা রকম হাতিয়ার আর নৌকার সংগ্রহ দেখতে দেখতে চলে যাই চীনাদের নানান রকম ঐতিহ্যবাহী পোশাকের সম্ভারের কাছে! চীনে কিন্তু বেশ কয়েক রকম নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে। তাদের চেহারা, পোশাক, ভাষা ও খাদ্যাভাসেও রয়েছে পার্থক্য। চীনের বিখ্যাত অপেরা অভিনেতাদের পরিচয়, তাদের মেকাপের ধরন, গায়ক গায়িকাদের পরিচয় বিস্তারিতভাবে জাদুঘরটিতে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে আমার কাছে অভিনব মনে হলো, চীনের বিখ্যাত গায়ক গায়িকাদের গান শোনার ব্যবস্থা দেখে। যে কেউ চাইলে তার পছন্দের গায়কের গান উপভোগ করতে পারবে৷ জাদুঘরে সুর ও সঙ্গীতের এই সম্ভার আমাকে চমৎকৃত করলো৷ জাদুঘর ঘুরে আবারও বেরিয়ে এলাম পথে৷
এখানে ছোট্ট একটি খাল রয়েছে, যার দুপাশে শুধু ফুল আর ফুল। আকর্ষণীয় বজরায় করে এই খালে ঘোরার ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু আমরা পথেই নেমে এলাম। এখানে একজন ব্যক্তি রঙিন পোশাকে রীতিমতো একটা বড় মোরগ সেজে ভুভুজেলা বাজিয়ে পর্যটকদের আনন্দ দিচ্ছে। আবার দেখি ধুমপানও করছে। চীনে প্রকাশ্য ধুমপানে কোন নিষেধ নেই দেখে অবাক হয়েছি। অনেকে ধুমপান করে অবশিষ্টাংশ পথেই ফেলে চলে যায়। এটিও অবাক করা ঘটনা। তবে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বেশ তৎপর। তাই দেশটি এত পরিচ্ছন্ন।

ইয়ংকিংফ্যাং এর ছিমছাম পথগুলোতে প্রচুর দোকান- কোনটা বইয়ের, কোনটা পোশাকের, কোনটা খেলনার। আবার ক্যান্টোনিজ খাবার চেখে দেখার জন্য রেস্টুরেন্টও আছে। এগুলো দেখতে দেখতেই চলে গেলাম একজন বিখ্যাত ব্যক্তির বাবার বাড়িতে, যে বাবা ছিলেন চীনা অপেরার একজন খল অভিনেতা। বাড়িটি দেখলেই বোঝা যায় বেশ পুরোনো। ওরা এতো চমৎকার করে সংরক্ষণ করেছে সব! আর বাংলাদেশে পুরোনো সবই ভেঙেচুরে ফেলা হচ্ছে ভেবে আবারও মন খারাপ হতে থাকে। বাড়িটার সামনে গিয়েই দেখি বিখ্যাত ব্যক্তির কুংফু স্ট্যান্ড আর ভাষ্কর্য! কে হতে পারে ইনি, বলুন তো? আচ্ছা, আমিই বলে দিচ্ছি, এটি আমাদের সবার প্রিয় এন্টার দ্য ড্রাগন খ্যাত ব্রুসলির বাবার বাড়ি!
বাড়িতে প্রবেশ করে বেশ রোমাঞ্চিত অনুভব করছিলাম। শৈশবে ব্রসলি খুবই দূর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন, তাই তাঁকে কুংফু শেখাতে পাঠানো হয় ঐ সময়ের বিখ্যাত কুংফুমাস্টার ইপম্যানের কাছে। ইপম্যান ও ব্রুসলির বিখ্যাত ছবির আদলে নির্মিত ভাষ্কর্য রাখা আছে বাড়িটির সামনে।

পুরো বাড়ি জুড়ে ব্রুসলি ও তাঁর পরিবারের অনেক স্মৃতি সংরক্ষণ করা আছে। সেই বিখ্যাত নানচাকু সচক্ষে দেখে নিলাম।


অকালপ্রয়াত এই অভিনেতার জন্য মনের ভেতর অনেক দু:খ জমা হয়। “জলের মতো হও”—ব্রুসলির এই দর্শনটা আমার এত প্রিয়। ঐ বাড়িতে গিয়ে নিজের প্রিয় দার্শনিক বাণীগুলো ডিজিটাল স্ক্রিনে প্রদর্শিত হতে দেখে অন্য ধরনের এক ভালো লাগায় মন আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ইচ্ছে করছিলো আরো কিছুক্ষণ থাকি। কিন্তু ঘড়ি বলছে ফিরে যাবার কথা। তাই প্রিয় ব্রুসলিকে পেছনে রেখে নিতান্ত অনিচ্ছায় ফিরে যাবার পথে পা বাড়াই৷
ভ্রমনগুরু your travel adviser