এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প কেন বিশ্বজুড়ে মানুষের বাকেট লিস্টে?

হিমালয়ের বেইজ ক্যাম্প ট্রেকের ছোট্ট গ্রাম লবুচে। চার হাজার নয়শ মিটার এ উচ্চতার এ গ্রামে আমরা উঠেছি  একটি টি-হাউজে। সারাদিনের ট্রেক শেষে রাতের খাবারে আয়োজনে হাজির হয় সব ট্রেকাররা। প্রতিটি টি-হাউজের দৃশ্য প্রায় একই রকম। চারদিকে জানালার পাশে বেঞ্চের মতো করে রাখা বসার জায়গা, আর তার সামনে টেবিল। ঘরের মাঝখানে ফায়ার প্লেসে ইয়াকের গোবর দিয়ে আগুণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যার চারদিকে গোল হয়ে বসে আছে ট্রেকাররা।

ট্রেকে এ ধরণের গেস্ট হাউজকে বলা হয় টি-হাউজ। ছবি লেখক

অনেক টেবিলে চলছে কার্ডের বিভিন্ন খেলা, তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আছে UNO। আমরা যেখানে বসেছি তার পাশে বসে থাকা সারা এসেছে আয়ারল্যান্ড থেকে। ইন্টারনেট এখানে অনেক দুর্লভ, তাই অভিযাত্রীরা একে একে অপরের সাথে গল্প করছে বেশি। সারা সহ মোট আঠারো জনের দল তারা, একজন হেড গাইড ছাড়াও তার সহকারী রয়েছে আরো তিনজন। দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য একজন নারী ডাক্তার। তিনিও দলের সাথে ট্রেক করছেন, তবে তার মূল দায়িত্ব সবার স্বাস্থ্যের প্রতি নজর রাখা। পুরো দলের সবাইকে একে একে পরীক্ষা করে দেখছেন তাদের কী অবস্থা, ডাক্তারের কাছ থেকে ছাড়া পেলে তবেই তারা পরের দিনের জন্য ট্রেকে নামতে পারবেন, আর  না হলে হেলিকপ্টার ডেকে ফেরত পাঠানো হবে কাঠমুন্ডুতে।

এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প। ছবি লেখক

সারার সাথে গল্প করছিলাম এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প নিয়ে। সারা জানালো তার দলের সবারই বাকেট লিস্টে ছিলো ইবিসি ট্রেকিং। আয়ারল্যান্ড ভিত্তিক তাদের ট্রাভেল এজেন্ট সবাইকে জড়ো করেছে এ ট্রিপের জন্য। নেপাল আসতে তাদের শুধু বিমান ভাড়াই গুণতে হয়েছে ৩,০০০ ডলার। এছাড়া ট্রেকিংয়ের খরচ আরো ৪,০০০ ডলার। শুধু তাই নয়, চার মাস ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে সে এ ট্রেকের জন্য। সপ্তাহে দুদিন ১০ কিমি দৌড়ে নিজের ফিটনেস লেভেল ঠিক করেছে। শীতের দেশের মানুষ তারা, তাই শীত তাদের জন্য কোন বিষয় নয়। কিন্তু উচ্চতা জনিত বাকি সব বিষয় নিয়ে বিস্তর পড়ালেখা করেছে সে। কিছুতেই যাতে এ ট্রেক শেষ করার স্বপ্ন হাতছাড়া না হয়।

এভারেস্ট ভিউ হোটেলের বারান্দায় বাংলাদেশ থেকে আসা ট্রেকাররা। ছবি জাফর সাদেক

শুধু সারা নয়, নারী-পুরুষ, দশ বছরের শিশু থেকে আশি বছরের বৃদ্ধ নির্বিশেষে হাজারো মানুষ প্রতি বছর হাজির হয় হিমালয়ের দেশ নেপালে। যাদের একটা বড় অংশের লক্ষ্য থেকে এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প পৌছানো। পর্বত বিজয় তাদের লক্ষ্য না, বরং হিমালয়ের পথে পথে দু সপ্তাহ এর সৌন্দর্য চর্ম চক্ষে একবার দেখার অভিজ্ঞতার জন্যই এ পথচলা। শুধুমাত্র বেইজ ক্যাম্প পৌছানোর লক্ষ্য থাকলে দু-সপ্তাহে শেষ হবে এ ট্রেক, আর যদি গোকিও লেক বা বিভিন্ন পাস সংযুক্ত হয়, তবে লাগতে পারে এক মাসও। কোনরকম টেকনিক্যাল ক্লাইম্বিং না থাকলেও এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প পর্যন্ত পৌছানো একটি বিশেষ অর্জনই বটে।

কোন কোন দিন তুষারপাতে এভাবেই ঢেকে যায় ট্রেক। ছবি আয়ুশ

গড়ে প্রতিদিন ১০-১২ কিলোমিটার এ উচ্চতায় দুসপ্তাহ ধরে ট্রেক করা সহজ বিষয় নয়। তার উপর পিঠেতো কম বেশি বোঝা থাকবেই। পর্বতের আবহাওয়া ক্ষণে ক্ষণে রঙ পরিবর্তন করে। সকালে হয়তো ঝকঝকে রোদের মধ্যে বের হলেন, কিছুক্ষণ পরেই দেখা গেলো আকাশ মেঘে ঢেকে গেলো, আর সেই সাথে তীব্র তুষারপাত। দিনের গন্তব্য শেষ করে বিকেলের দিকে আশ্রয় মিলবে কোন টি-হাউজে। রাতের গরম খাবার খেয়ে কিছুটা চাঙ্গা হয়ে ভালো মতো ঘুম দিবেন সেই উপায়ই নেই। অতি উচ্চতায় রাতের ঘুম নিরবিচ্ছিন্ন হবেনা, অক্সিজেনের স্বল্পতায় ঘুম ভেংগে যাবে শুকনো গলা নিয়ে। পানি খেতে গেলে দেখতে পারেন থার্মাল পানির পাত্রের মধ্যে পানি যেন বরফ হয়ে বসে আছে। সঙ্গে মাথা-ব্যথাতো খুব সাধারণ ঘটনা, সঙ্গে যোগ হয়ে যেতে পারে খাবারের অরুচি। এমন অবস্থায় বমি সহ আরো কিছু অতি-উচ্চতার অসুস্থতা জনিত লক্ষণ দেখা দিলে ট্রেকের পরিসমাপ্তি ঘটবে সেখানেই। একটাই সুবিধা, এ ট্রেকের প্রায় সব জায়গায় হেলিকপ্টার ডাকার সুব্যবস্থা আছে, বিপদের পড়লে ৬০০-৮০০ ডলার খরচ করে হেলিতে চড়ে ফিরে যেতে পারবেন লুকলা।

এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প ট্রেকের দারুণ একটি বিষয় হচ্ছে এখানে সাগরমাথা সংরক্ষিত অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের সীমা নির্ধারিত। তাই কেউ চাইলে গাইড ও পোর্টার ছাড়া একাই ট্রেকিং করতে পারবে। সাধারণত ট্রেকাররা নিজেদের সামর্থ্য অনুসারে এ ট্রেকিং করে থাকে। অনেকে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর ট্রেকিং করেন এবং যাবতীয় ট্রাভেল গিয়ার নিজেদের ব্যাগেই বহন করেন। অনেকে আবার শুধুমাত্র পোর্টার নেন, ম্যাপ দেখে নিজেদের মতো ট্রেক করেন। কেউ কেউ আবার গ্রুপ ট্রেকিং প্যাকেজও নিয়ে থাকেন যেখানে গাইড, পোর্টার সহ সব কিছুই দিয়ে দেয়া হয়। ট্রেকে সলো ট্রেকারই বেশি দেখা যায়।

পর্বতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মনের জোর। ছবি আয়ুশ

এত কিছুর পরও মোটামুটি ভালো খরচই হয় এ ট্রেকে। এর প্রধান কারণ, কাঠমুন্ডু থেকে এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প ট্রেকিংয়ের জন্য আপনাকে বিমানে আসতে হবে লুকলা। আবার সিজনে লুকলার ফ্লাইট ছাড়ে রামেচাপ থেকে। অন্তত ৪০০ ডলার লাগবে লুকলার রিটার্ন ফ্লাইটে। আর ট্রেকের ১২ দিনের খরচ, পোর্টার, ঢাকা-কাঠমুন্ডু-ঢাকা ফ্লাইট মিলে  এ খরচ পার হয়ে যাবে ১২০০ ডলার। দুসপ্তাহের এ ট্রিপের পরিকল্পণা হতে পারে নিন্মরূপ:

প্রথম দিন: ঢাকা থেকে কাঠমুন্ডু বিমানে পৌছানো। বিকেলে সব শপিং শেষ করে নিবেন।

দ্বিতীয় দিন: কাঠমুন্ডু থেকে লুকলা বিমানে পৌছানো। লুকলা বিমান থেকে নামা মাত্রই শুরু হবে ট্রেকিং, সেদিন সাধারণত ফাকদিং বা টকটক পর্যন্ত পৌছানো যায়।

তৃতীয় দিন: ফাকদিং/টকটক থেকে ট্যাংবোচে বা ডিবোচে।

চতুর্থ দিন: ট্যাংবোচে/ডিবোচে থেকে নামচে বাজার

পঞ্চম দিন: নামচে বাজারে একলিমাটাইজেশন ডে। এভারেস্ট ভিউ হোটেল দেখে আসা।

ষষ্ঠ দিন: নামচে থেকে ডিংবোচে।

সপ্তম দিন: ডিংবোচেতে একলিমাটাইজেশন।

অষ্টম দিন: ডিংবোচে থেকে লবুচে

নবম দিন: লবুচে থেকে এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প দেখে এসে গোরাখশেপে রাত্রিযাপন

দশম দিন: কালাপাথর দেখে একেবারে ফেরিচে পর্যন্ত নেমে আসা

এগারতম দিন: ফেরিচে থেকে নামচে বাজার

বারোতম দিন: নামচে থেকে লুকলা

তেরতম দিন: লুকলা থেকে কাঠমুন্ডু ফিরে আসা

চৌদ্দতম দিন: রিজার্ভ ডে

পনেরতম দিন: কাঠমুন্ডু থেকে ঢাকা ফিরে আসা।

ট্রেকিং পছন্দ করেন, কিন্তু পর্বতারোহী হবার ইচ্ছে নেই, এমন অনেকের বাকেট লিস্টে আছে এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প ট্রেক। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই এর থেকে। আপনি যদি এপ্রিল বা অক্টোবর মাসে বিমানে নেপাল যান, দেখতে পাবেন বিমানভর্তি লোকজন যাচ্ছে হিমালয়ের কোন না কোন ট্রেকে। এর মধ্যে এভারেস্ট বেইজ ক্যাম্প ট্রেকে দেখা পাবেন দেশের অনেক মানুষেরই।

ফিচার ছবি লেখক

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

ভ্রমণে সাথে থাকুক সেরা পাওয়ার ব্যাংক

একটা সময় ছিল যখন ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা ব্যাগে কিছু কাপড় ঢুকিয়েই ভ্রমণে বের হয়ে যেতো। প্রযুক্তিগত …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *