স্থলপথে নেপাল বা ভুটানের জন্য ট্রানজিট ভিসা যেভাবে করবেন

করোনার সময় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবার আগে ট্যুরিস্ট ভিসা বাতিল ও ট্যুরিস্ট প্রবেশ বন্ধ করেছিলো ভুটান। এরপর থেকে আর কখনো পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হয়নি এ দেশটি। কোভিড১৯ নিয়ন্ত্রণে তাদের সাফল্যও ছিলো ইর্ষণীয়। আড়াই বছরের বেশি সময় পরে ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২ থেকে আবার পর্যটকদের জন্য খুলছে ভুটান। অবশ্য তারা নতুন করে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে পর্যটকদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে।

নতুন নিয়মে ভুটান ভ্রমণকারী প্রতি পর্যটককে গুণতে হবে প্রতিদিন ৬৫ থেকে ২০০ ডলার করে সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট ফি। বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য এ ফি প্রতিদিন ১,২০০ গুলট্রাম (ভুটানের মুদ্রা)। নেপাল অবশ্য বেশ আগেই খুলেছে পর্যটকদের জন্য। বাংলাদেশ থেকে নেপাল ও ভুটানের সরাসরি ফ্লাইট থাকলেও অনেকে বাইরোডে নেপাল/ভুটান যেতে চান। আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু বাংলাদেশ থেকে সড়কপথে নেপাল বা ভুটান যাওয়ার জন্য ট্রানজিট ভিসা।

অক্সিজেনের দেশ খ্যাত ভুটান ছবি উইকিমিডিয়া

বাংলাদেশ থেকে ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল বা ভুটান যে কোন একটি দেশে যেতে হলে আপনার প্রয়োজন পড়বে ট্রানজিট ভিসার। ভারতের সাধারণ মাল্টিপল ট্যুরিস্ট ভিসা দিয়ে নেপাল/ভুটান গেলে আপনার পাসপোর্ট ব্ল্যাকলিস্টেড করবে ভারত এবং পরবর্তী সময়ে কোনভাবেই আপনি ভারতের ভিসা পাবেন না। ট্রানজিট ভিসা নিলে আপনার বর্তমান ট্যুরিস্ট ভিসা বাতিল বলে গণ্য হবে। ট্রানজিট ভিসার আবেদন ভারতের সাধারণ ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদনের মতোই, তবে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

ট্রানজিট ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

১. পাসপোর্ট। অন্তত ৬ মাসের মেয়াদ বাকি থাকবে হবে এবং কমপক্ষে দুটো পৃষ্ঠা খালি থাকতে হবে। পাসপোর্টের যে দুটো পৃষ্ঠায় আপনার তথ্যাদি আছে সেগুলোর ফটোকপি দিবেন (পৃষ্ঠা ৩ ও ৪)। পুরণো যতগুলো পাসপোর্ট আছে সেগুলোও অবশ্যই সঙ্গে দিবেন। ভারতীয় ভিসা আগে থেকে থাকলে সেটার ফটোকপি দিতে পারেন।

২. সদ্য তোলা ২x২ রঙিন ছবি দিতে হবে। ছবিতে পুরো মুখোমণ্ডল দেখা যেতে হবে এবং ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা হতে হবে। সদ্য তোলা বলতে তিন মাসের মধ্যে তোলা ছবিকে বুঝায়। ছবি অবশ্যই ল্যাব প্রিন্ট হতে হবে। একই ছবি সফট কপি দিয়ে অনলাইনে ভিসার আবেদন পত্র পূরণ করতে হবে।

৩. বর্তমান ঠিকানার স্বপক্ষে একটি প্রমাণপত্র দিতে হবে। কোন ইউটিলিটি বিলের ফটোকপি হলে হবে। যেমন বিদ্যুৎ, ল্যান্ডফোন, পানি বা গ্যাসের বিল। মনে রাখবেন বিলে আপনার ঠিকানা যেভাবে আছে ঠিক সেভাবেই ভিসার আবেদনপত্রে দিবেন। বিদ্যুৎ বিল কার্ড হলে সেটার ঠিকানার অংশ সহ ফটোকপি করে জমা দিবেন।

৪. পেশার প্রমাণ পত্র। চাকুরজীবি হলে অফিস থেকে একটা সনদ দিবেন যেটাতে লেখা থাকবে আপনি কোন অফিসে কি চাকুরী করেন এবং ভারত ভ্রমণে অফিসের কোন আপত্তি নাই। আর ছাত্র হলে স্টুডেন্ট আইডি কার্ডের ফটোকপি দিবেন। অবসরপ্রাপ্ত হলে সর্বশেষ চাকুরী রিজইন লেটার/সম্পন্ন করার সনদ দিবেন।

৫. আর্থিক স্বচ্ছলতার প্রমাণ দেখাতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার পাসপোর্টে ব্যাংক থেকে ১৫০ ডলার এনডোর্স করা থাকবে। এছাড়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট যেখানে সর্বশেষ ব্যালেন্স ২০,০০০ টাকা আছে, দিলে হবে। আর যদি আপনার ক্রেডিট কার্ড এনডোর্স করা থাকে সেক্ষেত্রে পাসপোর্টের যে পৃষ্ঠায় ক্রেডিট কার্ড এনডোর্স করা আছে সে পৃষ্ঠার ফটোকপি ও ক্রেডিট কার্ডের উভয় পিঠের ফটোকপি দিলে চলবে।

৬. জাতীয় পরিচয়পত্রের উভয় পিঠের ফটোকপি। যদি আপনার জাতীয় পরিচয় পত্র না থাকে তবে জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি দিবেন। মনে রাখবেন আপনার পাসপোর্টের তথ্যের সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম নিবন্ধনের তথ্যের মিল থাকতে হবে।

৭. অনলাইনে পূরণ করা ভারতের ভিসার আবেদন পত্র। অনলাইনে পূরণ করাল লিংক https://indianvisa-bangladesh.nic.in/visa/ মনে রাখতে হবে অনলাইনে আবেদন পূরণ করার সময় ভিসা টাইপ “ট্রানজিট ভিসা” সিলেক্ট করতে হবে। এরপর পোর্ট অব এন্ট্রি/এক্সিট নির্বাচন করবেন ভুটানের জন্য বাই রোড চেংরাবান্দা/জয়গাঁও এবং নেপালের জন্য বাই রোড চেংরাবান্দা/রাণীগঞ্জ  ।

 বাংলাবান্দা পোর্ট বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তাই আপনাকে পোর্ট সিলেক্ট করতে হবে বুড়িমারী হয়ে by road Chengrabandha/Jaygao অথবা  by road Chengrabandha/Raniganj। Travel another country before India এর ক্ষেত্রে  “No” এবং Travel another country after India এর ক্ষেত্রে “Yes” দিয়ে Nepal/Bhutan নির্বাচন করবেন। এছাড়া No of Entry এর ক্ষেত্রে “Double” নির্বাচন করবেন।

৮. ভুটানে থাকার হোটেল বুকিং (আগোডা বা বুকিং.কম দিয়ে বুক করে নিতে পারেন অথবা আপনার ট্রাভেল এজেন্টের পাঠানো বুকিং হলেও হবে)। নেপালের ক্ষেত্রে ভারতীয় দূতাবাসে জমা দেবার আগেই আপনাকে নেপালের ভিসা সংগ্রহ করতে হবে, তারপর ট্রানজিট ভিসার আবেদন জমা দিতে পারবেন।

৯. ঢাকা থেকে বুড়িমারী বাসের টিকেট (মূল কপি ও ফটোকপি) সংযোজন করতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার যাত্রার দিনের জন্য বাসের টিকেট কিনে আনতে হবে। ঢাকা-বুড়িমারী এস আর ট্রাভেলস, পিংকি, মানিক, শ্যামলী সহ বেশ কয়েকটি বাস চলে। তার মধ্যে শ্যামলীর এসি বাস শিলিগুড়ি পর্যন্ত যায়। বাস ভাড়া নন এসি ৭০০-৮০০ টাকা, এসি ২,০০০ টাকা। আপনি টিকেট কেনার সময় বলবেন ভিসা না পেলে ফেরত দিবেন, সেক্ষেত্রে ভিসা না হলে বেশিরভাগ টাকাই রিফান্ড পাবেন।

বর্তমানে মিতালী এক্সপ্রেস যেহেতু সরাসরি নিউ জলপাইগুড়ি যাচ্ছে, এর টিকেট দিয়েও ট্রানজিট ভিসার কাজ চলার কথা। সমস্যা হচ্ছে ভিসা না থাকলে টিকে কেনা যায়না, তবে আপনার যদি ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসা থেকে থাকে এবং সেটার পোর্ট নিউ জলপাইগুড়ি থাকে তবে সেটা দিয়ে টিকেট কেটে ট্রানজিট ভিসার আবেদন করতে পারার কথা। আর না হলে বাসের টিকেট কেটে আবেদন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মূল টিকেট পাসপোর্টের সাথে ফেরত দিবে।

পর্যটক সংখ্যা সীমিত রাখে ভুটান ছবি উইকিমিডিয়া

ট্রানজিট ভিসা সংক্রান্ত আরো কিছু তথ্য:

  • ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদন করলে যেমন কয়েকদিনের মধ্যেই পাওয়া যায়, ট্রানজিট ভিসার ক্ষেত্রে কিন্তু তেমন হবেনা। তবে আবেদনপত্র পূরণের নিয়ম বেশিরভাগই একই রকম, শেষের কয়েকটি বিষয় ছাড়া (টিকেট ও হোটেল বুকিং)।
  • ট্রানজিট ভিসা দিবে ১৫ দিনের জন্য। পাসপোর্ট ফেরত পাবেন যাত্রার ১/২ দিন আগে। এক্ষেত্রে খুব হিসেব করে আপনাকে আবেদন ও বাসের টিকেট কাটতে হবে। যেদিন বাসের টিকেট কাটা, সেদিনকে ডেইট অফ জার্নি বলে ধরা হবে, সেদিনের আগের দিন আপনার ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
  • ট্রানজিট ভিসায় আপনি আসা ও যাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ৭২ ঘন্টা অবস্থান করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে যাওয়ার সময় চাইলে দার্জিলিং দেখে যেতে পারেন। আর ফুটশিলিং চলে গেলে ভুটানে এন্ট্রির কাজ শেষ করে সীমান্তে এপারে ভারতের মধ্যে এসে থাকবেন।
  • ট্রানজিট ভিসার ফি নেই, যথারীতি আইভাকে প্রসেসিং ফি ৮০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিকাশ/ক্রেডিট কার্ড চার্জ পড়তে পারে আরো ২০-৪০ টাকা। আর ভুটানের ভিসা লাগবেনা, এন্ট্রি সিল পাবেন বিনামূল্যে। সাধারণত ৭ দিনের এন্ট্রি পারমিট দেয়।
  • ভুটান/নেপাল এন্ট্রির জন্য সেখানকার ইমিগ্রেশন অফিস থেকে এন্ট্রি ফরম নিয়ে ফরমটা পূরণ করে সঙ্গে এ কাগজপত্রগুলোও দিবেন।
    • পাসপোর্ট (অন্তত ৬ মাস মেয়াদ থাকতে হবে)
    • হোটেল বুকিং (আগোডা/বুকি.কম থেকে করে রাখতে পারেন)
    • পাসপোর্টের ফটোকপি
    • পাসপোর্ট সাইজের ছবি

ভিসা পনেরদিনের পেলেও কার্যত ৭ দিনের বেশি ভুটানে/নেপালে থাকতে পারবেন না। আসা-যাওয়ায় বাকি ৭ দিনের বেশির ভাগ সময় চলে যাবে। তাই ট্রানজিট ভিসা নেবার সময় এসব বিষয়গুলো মাথায় রেখে নিবেন। ঝামেলা একটু বেশি মনে হলেও বিমান ভাড়ার টাকা দিয়েই আপনার ভুটান ও দার্জিলিং ঘোরা হয়ে যাবে। আর স্থলপথে ভুটান/নেপাল অবশ্যই সারা জীবন মনে রাখার মতো একটি ট্রিপ হবে।

ফিচার ছবি উইকিমিডিয়া

About Muhammad Hossain Shobuj

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে পরবর্তীতে আইবিএ থেকে এক্সিকিউটিভ এমবিএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করেন। লেখালেখিটা শখের কাজ, ঘোরাঘুরিও। এ পর্যন্ত দেশের ৬৩ টি জেলা ও ১২ দেশে ঘুরেছেন।

Check Also

মিতালী এক্সপ্রেস: ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ির ট্রেনের বিস্তারিত

আগামী পহেলা জুন থেকে চালু হবে ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি (এনজেপি) রুটের নতুন আন্তদেশীয় ট্রেন মিতালী এক্সপ্রেস। …

Leave a Reply

Your email address will not be published.