CNS Arena তে ক্যাম্পিং ও লক্ষণসাহার জমিদার বাড়ি দর্শন

বেশ কদিন ধরে বাপ্পী আমাকে গুতাচ্ছে, নরসীংদির লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়িতে যাওয়ার জন্য। নানা ব্যস্ততায় হচ্ছিলোনা। অবশেষে ঠিক করলাম সেই প্রোগ্রাম। সাধাসিধে ট্রিপ, বৃহস্পতিবার রাতে স্কুটার নিয়ে চলে যাবো আতলাপুর, রাতে সেখানে ক্যাম্পিং করে পরের দিন সকালে জমিদার বাড়ি দেখে ঢাকায় ফিরে আসবো।মোট ৮ জন হলাম আমরা। তিন মোটর সাইকেলে ৬ জন, সাইকেলে একজন আর সর্বশেষ ব্যক্তি সাধারণ পরিবহন!

তিন মোটরসাইকেলের মিটিং পয়েন্ট ছিলো বসুন্ধরা আবাসিকের গেটে। সাইকেল চলে গেলো সবার আগে আগে। আনোয়ার ভাই বিশ্বরোড এসে বিআরটিসি বাসের বিরাট লাইন দেখে একটা একটা মোটরসাইকেল ভাড়া করে চলে গেলেন কাঞ্চন ব্রীজ। টোল ঘর পার হয়ে ডাঙ্গা বাজারের রাস্তায় উঠে সিএনজি নিয়ে পৌছে গেলেন ক্যাম্পসাইটে।

চমৎকার একটা সাইট ছবি জোনায়েদ

আমরা তিন মোটরসাইকেল খুব সাবধানে রওনা হলাম সাইটের উদ্দেশ্যে। বাপ্পীর অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি হাইওয়েতে। তাই তাকেই লিড দিতে বললাম, মাঝে স্কুটার নিয়ে আমি আর সবশেষে জুনায়েদ। অনেক জায়গায় কাজ চলছে, তাই সাবধানে চালিয়ে কাঞ্চন ব্রীজ পৌছাতে ত্রিশ মিনিটের মতো লাগলো। ডাঙ্গাবাজারের রাস্তায় উঠে আরো গতি কমে গেলো আমাদের।

ছোট সিংগেল রাস্তা। ৭ কিমির শেষ দুই কিমি একেবারেই ভাঙ্গা, রাস্তার উন্নয়নের কাজ চলছে। যাইহোক আতলাপুর বাজার পার হয়ে খুজে বের করলাম ক্যাম্পসাইট CNS Arena শীতলক্ষ্যার ধারে ছোট সাজানো গোছানো সাইট। পৌছেই দেখি ক্ষিদেয় পেট চোঁচোঁ করছে। খিঁচুড়ি, ডিম আর মুরগী দিয়ে ডিনার সেরে জুনায়েদের নের্তৃত্বে ছবি তোলা শুরু হলো। এরকম একজন দলে থাকা খুব ডিমোটিভেটিং, তার তোলা ছবি দেখে আর কেউ মোবাইল বের করতে চায়না!

শীত লক্ষ্যা নদীর বাতাসে রাতটা ছিলো অসাধারণ

এদিকে আমাদের সঙে আনা ভেটকি মাছ বার বি কিউ করতে দিলাম আমরা, সঙ্গে চললো চিকেনও। ভরপেট খেয়ে দেয়ে অনেক রাত উনো খেলার পর এবার ঘুমানোর পালা। রীতিমতো শিশির পড়ছে। তাঁবু পাতা হয়েছে একটা শেডের নিচে। আমরাও তাঁবু নিয়ে এসেছি, তবে সেখানে আগে থাকা তাঁবু দেখে মাত্র একটা বের করলাম। সেটাতে জাফর যেয়ে নদীর পাড়ের মাচায় তাঁবু খাটিয়ে ফেললো। বলতে বাধ্য হলাম এরকম ক্যাম্পসাইটে কখনো থাকিনি। হাইকমোড বাথরুম, গোসলের সুব্যবস্থা, খাওয়া-দাওয়া সব মিলে এলাহী কারবার।

এতো খাবর শেষ করতে পারলামনা আমরা ছবি জোনায়েদ

স্লিপিং ব্যাগের দরকার ছিলোনা, অত ঠান্ডা পড়েনি। ভালোই ঘুম দিলাম, শুধু সকালে রোদ ৮ টার সময় তাঁবুর উপর পড়ার কারণে ঘুম থেকে উঠতে বাধ্য হলাম।সকালে নাস্তা করে ক্যাম্পসাইট থেকে বের হয়ে চলে গেলাম জমিদার বাড়ি দর্শনে। আলতাপুর থেকে মাত্র তিন কিলো দূরে ডাঙ্গা বাজার। নরসীংদির শুরুটাও এখান থেকে। আলতাপুর পড়েছে নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জে।

এই ছিলো সকালের নাস্তা ছবি বাপ্পী

বাজার পার হয়ে হাতের বামে সামান্য একটু ঢুকলে জমিদার বাড়ি, কিন্তু আমি খেয়াল না করে সামনে চলে গেছি। সেখানে তমালের সাথে দেখা। বাজারে আমাদের বহর দেখেই সে আমাদের পিছু নিয়েছি। স্থানীয় গাইড পেয়ে তার নের্তৃত্বেই আমরা গেলাম লক্ষণ সেনের জমিদার বাড়িতে। শান বাধানো পুকুর ঘাট, মন্দির, জমিদার বাড়ি, আর পুজো মন্ডপ নিয়ে এ বাড়ী।

লক্ষণ সাহার জমিদারি নিয়ে খুব কম তথ্য জানা যায়। তবে বাড়ির শৈল্পিক সৌন্দর্য দেখার মতো। বর্তমানে বাড়িটি স্থানীয়দের কাছে উকিল বাড়ি হিসেবে পরিচিত। লক্ষণ সাহার ছেলে নারায়ণের কাছ থেকে এ বাড়িটি একজন উকিল কিনে নিয়েছিলো বলে সবাই এ নামে চিনে।বর্তমানে উকিল সাহেব তার স্ত্রীর নামে এর নাম রেখেছেন জামিনা মহল।

লক্ষণ সাহার জমিদার বাড়ি ছবি লেখক

দূর্ভাগ্য আমাদের, এত সুন্দর একটা প্রত্নতাত্মিক নিদর্শন এভাবে অবহেলায় পড়ে আছে। অথচ এধরণের বাড়ি হতে পারতো ওই উপজেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। বাড়ির পেছনের গেইট ব্যবহার করে দোতলায় উঠে কক্ষগুলো ঘুরে দেখলাম। মূল বারান্দার পাশে দুটো চমৎকার ছোট ছোট বারান্দা, আর অসাধারণ সব কাজ। মন্দিরের কাজগুলো অনেক সুন্দর। ঘুরে ঘুরে রুমগুলো দেখে নিচে এসে কিছুক্ষণ সেই পুকুরঘাটে আড্ডা দিলাম আমরা।

জমিদার বাড়ির শান বাঁধানো পুকুর ঘাট ছবি লেখক

এর মধ্যে তমাল প্রস্তাব দিলো বাজারে দৈ খাওয়ার। ঢাকায় ফেরার সময় আমরা কোথাও থামবোনা ঠিক করেছিলোম। তাই আমরা এ প্রস্তাব মেনে নিয়ে স্থানীয় একটি দোকানে চরম সুস্বাদু দৈ খেলাম। ভাগ্যিস রাজি হয়েছিলাম, না হলে বিরাট মিস হতো। ফিরতে একঘন্টারও কম সময় লেগেছে। শুক্রবার রাস্তাঘাট ফাকা ছিলো, এছাড়া তিনশ ফিটের অবস্থা যাওয়ারটাও চেয়ে ভালো ছিলো অন্তত।

কীভাবে যাবেন: ব্যক্তিগত পরিবহন থাকলে ৩০০ ফিট ধরে কাঞ্চন ব্রীজ পার হয়ে টোল প্লাজার পেছনে ডাঙ্গাবাজারের রাস্তায় ৭ কিমি গেলে আতলাপুর পাবেন, আতলাপুরে বাজারে কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই দেখিয়ে দেবে। আর ব্যক্তিগত পরিবহন না থাকলে বিশ্বরোড থেকে বিআরটিসি বাসে আসতে হবে কাঞ্চন ব্রীজ। সেখান থেতে আতলাপুরের সিএনজি বা ইজি বাইক পাবেন। গুগল ম্যাপ ডিরেকশন:

https://goo.gl/maps/eL98TwLAhFdHv8K3A

সারাদিন এখানে বসেই কাটিয়ে দেয়া যায় ছবি জোনায়েদ

এছাড়া তাদের ফেইসবুক পেইজে যোগাযোগ করে নিতে পারেন: যোগাযোগের নাম্বার: 01717038643।

https://www.facebook.com/CNSArena

খরচ: বাসে ও সিএনজিতে যেতে জনপ্রতি ১০০ টাকার মতো খরচ হবে। ক্যাম্প সাইটে তাঁবু, তোশক, বালিশ এগুলো থাকবে। রাতের খাবার খিচুড়ি, মুরগি, ডিম, সালাদ। ডিনারের পরে মুরগীর বারবিকিউ। আর সকালের নাস্তা পরোটা, সব্জি ও ডিম। এছাড়া চা/কফি থাকে। জনপ্রতি ১,৫০০ টাকা (অন্তত দুজন আসতে হবে)।

ফিচার ছবি: Zonayed Chowdhury

About Muhammad Hossain Shobuj

Check Also

শরৎ এর পয়গাম নিয়ে কাশবন

শরৎকাল বলতেই মাথায় যে জিনিসটা সবচেয়ে আগে কাজ করে তা হল কাশবন। কাশবন মানেই বাঙালির …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *