Home ভ্রমণ তথ্য বরিশালে শুরু নোয়াখালী তে শেষ,পূজোর ছুটি জম্পেশ!

বরিশালে শুরু নোয়াখালী তে শেষ,পূজোর ছুটি জম্পেশ!

129
0

শরৎ আগমনের সাথে সাথেই প্রকৃতি ছেয়ে গেছে শুভ্র কাশফুলে,সেইসাথে শুরু হয়েছে পূজোর আয়োজন। এই আয়োজনে মনে পরে গেলো দুইবছর আগে পূজোর ছুটিতে বরিশালে শুরু হয়ে নোয়াখালী গিয়ে শেষ হওয়া এক ভ্রমণের গল্প। ২০১৭ সালের পূজোর ছুটি শুরু হলো অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে দুইদিন আগে। আমি তখন সিলেটে থাকি আর শ্রীমঙ্গলের পাশে কমলগঞ্জে প্রজেক্ট অফিস তাই নিয়মিত কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল-সিলেট যাতায়াত করতে হচ্ছে। বৃহস্পতিবার অফিস শেষ করে ছুটি শুরু হবে তারপর ঢাকায় এসে কোথাও যাওয়া হবে এরকম একটি পরিকল্পনা ছিলো। কিন্তু বুধবার হঠাৎ করে অফিস থেকে জানানো হলো ঢাকা অফিসে জরুরী কাজ ডকুমেন্ট নিয়ে যেতে হবে, সাথে বোনাস হিসেবে পাবো বৃহস্পতিবার ছুটি।

তো আর ভাবনা চিন্তা না করে অফিস থেকে সকালে রওনা হয়ে গেলাম গরীবের উড়োজাহাজ এনায় করে,বিকালের মধ্যে ঢাকায় এসে অফিসের কাজ গুছিয়ে বের হলাম আর অগ্রীম শুরু হয়ে গেলো পূজোর ছুটি ।

এখন তো আর ভালো লাগছেনা। বেশী অগ্রীম ছুটি হওয়াতে কোথাও যাওয়ার সঙ্গী পাওয়া যাচ্ছেনা। এদিকে ঢাকায় বসেও ভালো লাগছেনা।

শেষ বিকেলে সমুদ্রস্নান। ছবিঃ আশিক ভাই

কি করি আজ ভেবে না পাই

কোন বনে যে ছুটে বেড়াই।

আশিক ভাইর সাথে একটা প্ল্যান ছিলো বাগেরহাট যাওয়ার তবে সোজা পথে নয়,ঢাকা থেকে এম মধুমতি স্টিমারে করে হুলারহাট যাবো তারপর রায়েরকাঠি জমিদার বাড়ি ও মঠ দেখে যাবো মসজিদের নগরী বাগেরহাটে তারপর সেখান থেকে খুলনা হয়ে ঢাকা আসবো।

লাল কাকড়ার দ্বীপে দৌড়াদৌড়ি। ছবিঃ লেখক

এই প্ল্যানে হুট করে যুক্ত হলো ওয়াফি ভাই ও ভাতিজা সাগর,বৃহস্পতিবার সকালে দেখা করলাম,হাল্কা আলাপ আলোচনা করে ৫ টার মধ্যে সদরঘাট চলে গেলাম।

মধুমতিতে বসে খলিল ভাইর সাথে গল্প হচ্ছে চা হচ্ছে কিন্তু বাকী সদস্যদের দেখা নেই,কিছুক্ষন পরে ভাতিজা আসলো এর মধ্যে ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো ভিজতে ভিজতে আসলো আশিক ভাই কিন্তু ওয়াফির দেখা নেই,টানটান উত্তেজনা জাহাজ ছাড়ার টাইম হয়ে গেছে খলিল ভাইর কড়া চাহনি এক মিনিট দেরি করা যাবেনা জাহাজে কয়েকজন ভি আই পি যাত্রী আছে তাই ওয়াফিকে ছাড়াই আমাদের তিনজনের টিকেট নিলাম। চিরচেনা বাংলা ছবির পুলিশের মতো শেষ দৃশ্যে হাজির হলো ডাবল ডিমে অভ্যস্ত ওয়াফি ভাই। জাহাজের সর্বশেষ বাধনটা খুলে ফেলার পরে আসলেন উনি,টিকেট নিয়া লাফিয়ে উঠলেন জাহাজে আমরাও তৃপ্ত হলাম।

ভর দুপুরে কাকড়ার খোজে। ছবিঃ আশিক ভাই

দুপুর থেকেই আকাশের খুব মন খারাপ,সন্ধ্যা থেকেই বৃষ্টি তাই মধুমতির খোলা উঠানে শুয়ে শুয়ে চাঁদ দেখতে দেখতে যাওয়ার ভাবনায় ছেদ পরলো,বাধ্য হয়ে ভিতরে বসেই আড্ডা দিচ্ছিলাম। এর মধ্যে রাতের খাবারের অর্ডার করা হয়েছে। আইটেম সেই চিরচেনা স্টিমারের খিচুরি-বেগুন ভাজি-চিকেন-ডিম আর জলপাই আচার।হাজার বার খেয়েই তৃপ্তি হয়না এই আইটেমের তাই প্রতি ট্যুরেই থাকে এই কমন আইটেম। খেতে খেতে ট্যুর প্ল্যান নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো,মধুমতির ডাইনিং এ বেশ কয়েকবার ই ট্যুর প্ল্যান উত্তর মেরু থেকে দক্ষিন মেরু,চাঁদপুর থেকে বরিশাল এরকম পরিবর্তন হয়েছে,ঐতিহ্য রক্ষা করে এবারো ব্যাতিক্রম হলোনা হুলারহাট নেমে বাগেরহাট যাওয়ার পরিবর্তে জনসমর্থন বেশী পরলো বরিশাল নেমে কুয়াকাটা যাওয়ার। তাই অগত্যা কুয়াকাটা যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।

ফাতরার বন, দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। ছবিঃ লেখক

জাহাজ চাঁদপুর ঘাটে ভীরবে ঠিক এই সময় ঝড়ের গতিবেগ প্রচন্ড বেড়ে গেলো,খাওয়া শেষ করে মাস্টার ব্রিজে গেলাম কিন্তু গিয়ে দেখি তটস্থ অবস্থা,জাহাজ ঘাটে না ভীরে অন্য দিকে নোঙর করে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা চলছে,এরমধ্যে খবর দেখলাম তিন নাম্বার সিগন্যাল দেওয়া হয়ে গেছে আবহাওয়া অফিস থেকে,জাহাজ নোঙর করে রাখা হয়েছে ঝড়ের গতিবেগ বাড়ছে,সেইসাথে প্রচন্ড বৃষ্টি ও বিজ্রপাত। কিন্তু একটা বিষয় প্রমাণিত হলো, কেনো মধুমতি কে এই মূহুর্তে দেশের সবচেয়ে সেরা ও নিরাপদ যাত্রীবাহী নৌযান বলা হয় এ প্রশ্নের।

ক্যানেলে মাছ শিকার। ছবিঃ লেখক

তিনতলায় বসে ঝড়-বৃষ্টির পরিমান আমরা খুব একটা টের পাচ্ছিলাম না। কি পরিমান ঝড় হচ্ছে সেটা প্রত্যক্ষ্য করার জন্য নিচে গেলাম, গিয়ে দেখি ফ্লোর ঢেউয়ের পানিতে ভিজে একাকার,যারা ডেকের যাত্রী ছিলেন সবাই বিছানা গুটিয়ে বসে আছে,কয়েক ফুট উচু হয়ে ঢেউ আর রোলিং, তবুও সবাই নিশ্চিন্ত, কারো মধ্যেই অনিরাপদ বোধটা চোখে পরেনি।

ফাতরার বনের পথে। ছবিঃ লেখক

ঠিক এই সময়ে ফেসবুকে বিভিন্ন লঞ্চ থেকে অনেকের কান্নাকাটি, লঞ্চের কেবিনের দড়জা উড়ে গেছে কোনোটা ডুবে যাচ্ছে যাচ্ছে অবস্থা এরকম লাইভ ভিডিও আর পোস্ট দেখলাম।

অবশেষে রাত তিনটায় ঝর থামলো, জাহাজ চাঁদপুরে ঘাট  দিলো ক্যাপ্টেনের ভাষায় বছরের সেরা ঝড়! যার স্বাক্ষী আমরাও। কখনো কখনো কিছু খারাপ ভালোর জন্য হয়,তেমনি এই ঝড়ের অনাকাঙ্ক্ষিত দেরীতে কার্যত একটি দারুন লাভ হলো,বরিশাল পৌছানোর আগেই সকাল হয়ে গেলো,কীর্তনখোলার অপরুপ দৃশ্য দিয়ে সকাল শুরু হলো।

কীর্তনখোলায় পালতোলা নৌকা। ছবিঃ লেখক

সকাল ৭ টায় বরিশাল নেমে নাস্তা করে কুয়াকাটা যাত্রা শুরু হলো।

ধান-নদী-খাল তিনে মিলে বরিশাল,তো সকাল বেলা একটা চা হাতে এরকম দৃশ্য যেকোনো বিচারেই অতুলনীয়। সবুজ চরের গায়ে দোলা দিয়ে যাওয়া পাল তোলা নৌকা,জেলেদের মাছ ধরা,ঝরের রাতের শেষে স্নিগ্ধ সকালে পাল্লা দিয়ে লঞ্চগুলোর ছূটে চলা স্বপ্ন কে বাড়ি পৌছানোর জন্য,এ দৃশ্য অতুলনীয়। 

নতুল্লাবাদ অনেক সময় দাঁড়িয়ে রইলাম ঢাকা থেকে আসা বাসের আশায় তারপর ওয়াফি ভাইর ইচ্ছায় উঠলাম এক চলন্ত লোকাল বাস নামক গোডাউনে,এমন কোনো মালামাল নেই যা এই বাসে উঠানো বাকী ছিলো। দরজা,জানালা,টিউবওয়েল,স্যান্ডেল,শাড়ি,আপেল-কমলা,নাট-বল্টু,ফ্যান-টিউব লাইট সবই ঠাই পেয়েছে এ বাসে।

বক্সের ভিতরে থরে থরে সাজানো রেকে রাখা মালামাল যেনো দোকান সাজানো, আর ছাদে তো আকাশ ছুই-ছুই ভাব,প্রথমে বুঝতে পারিনি এরকম অবস্থা পরে দেখি একজায়গায় থামায় আর এক ঘন্টা মালামাল নামায় এরকম করতে করতে তিনটায় গেলাম সাগরকন্যা কুয়াকাটা,পূজোর ছুটিতে যেনো পর্যটকের ভীরে উপচে পরছে সমুদ্রকন্যা,তীল ধারনের ঠাই নেই এরকম অবস্থা। 

ফাতরার বনে সুন্দরবনের মতো ওয়াকওয়ে। ছবিঃ লেখক

এতো ধকল গেলো এখন একটা মাথা গোজার ঠাই তো চাই !  তাই হোটেল খুজতে শুরু করলাম,৪০০ টাকার হোটেল বলে ৪০০০ টাকা,তাও এরকম ভাবে বলে মনে হচ্ছে উনারা হাজ্বী মুহাম্মদ মহসীনের বংশোদ্ভূত বলেই কেবলমাত্র আমাদেরকে এই সুযোগ দিচ্ছেন নইলে কোনোভাবেই সম্ভব হতোনা। শেষতক হোটেল পাড়া পেরিয়ে চলে এলাম অজোপাড়া গায়ে,টিনের ঘরের দুইরুম নিলাম মেহেদী ভাইর বাসায় ৮০০ টাকায়। তারপর রাজ্যের ক্ষুধা পেটে নিয়ে হামলা হলো হোটেলে কোরাল মাছ আর চিংড়ি দিয়ে ভাত খেয়ে এবার শরীর জুড়ানোর পালা সমুদ্র জলে।

ওয়াকওয়ে শেষ এবার কাদাপানি মাড়িয়ে পারি দেওয়া। ছবিঃ আশিক ভাই

কুয়াকাটায় এবারের পানিটা বেশ মিস্টি লাগছিলো,কোনো লবনাক্ততা নেই,সূর্যাস্ত পর্যন্ত স্নান চললো আশিক ভাইর শিশুসুলভ আনন্দ দেখে আর ঢেউয়ের সাথে জলকেলিতে।

রাতে বিচে বসে ফিস ফ্রাইর স্বাদ এখনো জিভে লেগে আছে,সকালে বাইকে করে সূর্যোদয় দেখতে যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু মাঝরাত থেকে বৃষ্টি শুরু হলো আমরাও যেনো হাফ ছেরে বাচলাম। সকালে বিচে গিয়ে খোজ নিলাম ফাতরার চরে যাওয়ার বিষয়ে, দারুন প্যাকেজ গেলাম ২৫০ টাকায় যাওয়া আসা প্রতিজন টোটাল ৪ ঘন্টার প্যাকেজ।

কাদাপানি মাড়িয়ে আসলে পাওয়া যাবে শান্ত নিরিবিলি এই সৈকত। ছবিঃ লেখক

ফাতরার বনে গিয়ে ভালো সময় কেটেছে,এটা সুন্দবনের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, নৌকায় যেতে হয় চ্যানেল টা খুব সুন্দর সাথে আছে নিশ্চুপ নিরিবিলি এক সৈকত। ফাতরার বন ঘুরে এসে আবার সমুদ্রে স্নান করে ফেরার পালা কিন্তু ফিরছি কোথায়??? 

বড় প্রশ্ন হয়ে গেলো,বাগেরহাট যাওয়ার কথা তাই সিদ্ধান্ত হলো আগে বরিশাল যাই,বরিশাল গিয়ে ভাতিজাকে ঢাকার বাসে তুলে দিয়ে আমরা রয়ে গেলাম। হোটেল খুজতে গিয়ে এক শুভাকাঙ্ক্ষীর অনুরোধে উঠলাম বি এম কলেজের হোস্টেলে। রাতে বের হলাম পূজা দেখতে আর স্ট্রিট ফুড খেতে।কাঠপট্টির এক বাড়িতে দেখলাম পূজোর শেষাংশ। সেখান থেকে বের হয়ে বিবিরপুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে এক অদ্ভুত খিচুড়ি খেতে খেতে প্ল্যান হলো সকালে লক্ষীপুর যাবো। সকাল ৬ টায় পারিজাত লঞ্চ ছাড়ে মজু চৌধুরীর ঘাটের উদ্দেশ্যে।সকালে উঠে দৌড়ে এসে লঞ্চে উঠলাম সকাল বেলার অপূর্ব সব দৃশ্য দেখতে দেখতে ভেসে চলছি তিনজন ঘুরবাজ, যাদের নিমিষেই ঘুরে যায় ট্রিপের প্ল্যান,একজন বলার সাথে সাথেই বাকীরা এমনভাবে সমর্থন করে যেনো আমি এটাই বলতে চেয়েছিলাম।

মটরবাইক চালকদের বানানো প্যাকেজ। ছবিঃ লেখক

শেষ পর্যন্ত সারাদিন লক্ষীপুরে দালাল বাজার জমিদার বাড়ি,কামানখোলা জমিদার বাড়ি,চর আলেকজান্ডার বাধ দেখে নোয়াখালী হয়ে কেউ ঢাকা কেউ সিলেটে গিয়ে ট্যুর শেষ হলো।

তবে ভ্রমণ কালীন সময়ে ময়লা আবর্জনা যেখানে সেখানে ফেলিনি,বয়ে নিয়েছি নির্দিষ্ট স্থান না পাওয়া পর্যন্ত।

বরিশাল থেকে লক্ষীপুর ভ্রমণের গল্প পড়ুন এই লিঙ্কে https://www.vromonguru.com/all-divisions/chattagram-division/barishal-loxipur/

স্টিমার নিয়ে বিস্তারিত পড়ুন এই লিঙ্ক থেকে https://www.vromonguru.com/all-divisions/dhaka-division/rocket-steamer-bangladesh/

ভ্রমণগুরুতে ছাপা হওয়া আমার সব পোস্ট পড়তে পারেন এই লিঙ্ক থেকে https://www.vromonguru.com/author/jewel/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here